সান্ত্বনা চট্টোপাধ্যায়

 

শান্তনুঃ

কথায় আছে স্বপ্নবিলাসী। তা সবাই বলে আমাদের বিলাস রায় ওরফে মন্টু এই খেতাব সহজেই অর্জন করতে পারে। ছোটোবেলায় হাফপ্যান্ট পরা অবস্থা থেকেই মন্টুকে দেখলেই আমরা বলতাম, ‘এই যে স্বপ্নবিলাসী এসে গেছেন।’ তা মন্টু ঠাট্টাতামাশা গায়ে মাখত না কোনোকালেই।

‘স্বপ্ন দেখা অত সোজা নয়, বুঝলি, স্বপ্ন দেখতে এলেম দরকার। আমি কী রকম টেকনিকালার স্বপ্ন দেখি তোরা জানিস! শুনলে তোরা হিংসায় কাঁচা পেয়ারা হয়ে যাবি। তোরা হাজার চেষ্টা করলেও আমার মতন স্বপ্ন দেখতে পারবি না, বুঝলি – অনুভূতি দরকার, বুঝলি, অনুভূতি – তোদের মতন কেঠো পাজীদের কম্ম নয়।’

‘কেন রে ব্যাটা! কী এমন স্বপ্ন দেখিস, যে আমরা দেখতে পারব না?’ রতন তো রেগে আগুন, ‘আর রঙিন স্বপ্ন দেখাটা কী এমন ব্যাপার, এই তো সেদিন আমি দেখলাম লাল সালোয়ার পরে পরী চলেছে রাস্তা…’

‘এই, এই, শুরু হল প্রেমাখ্যান… চুপ, চুপ কর বলছি!’ আমরা সবাই তেড়ে উঠলাম।

‘সত্যি, একে নিয়ে আর পারা যায় না, দেখ না দেখ পরীকে টেনে আনে। তুই ব্যাটা পরীর স্বপ্ন দেখার কে রে? তোকে পাত্তা দেয়? একবারও তোর দিকে ফিরে তাকায়? ফেকলু কোথাকার! পরীর স্বপ্ন দেখতে হলে বিমান দেখবে, পরীর সঙ্গে ওর হেভি ইয়ে, পরী এখান দিয়ে যাবার সময় আড়চোখে কেমন তাকায় দেখেছিস বিমানের দিকে!’ ছটকু ফোড়ন কাটে।

বেটা বিমানের চামচা, আমাদের ভাল না লাগলেও কেউ কিছু বলি না। কী করে বলব – বিমানের চেহারাটা দেখলে গলা দিয়ে আর কথা বেরোয় না। এই লম্বা, ইয়া চওড়া বুক, একেবারে অরণ্যদেব; আমরা তো সব ছুঁচো ওর কাছে। আমাদের কি ইয়ে আছে শালা যে পরী বিমানকে ছেড়ে আমাদের দিকে তাকাবে?

মনে মনে বিমানকে পরীর সামনে এক চড়ে নর্দমায় ফেলে দিলাম। এ ছাড়া আর উপায় কী, আর কি-ই বা করতে পারি। পরী আমাদের পাড়ার সম্পদ। যেমন দেখতে, তেমনি লেখাপড়ায়, তেমনি খেলাধুলায়, এক্কেবারে, সর্বগুণসম্পন্না যাকে বলে। পাড়ার সব জোয়ান ছেলেদের বুকে পরীর নামে ব্যাথা আছে। আমার ব্যাথাটা অনেক গভীর, অনেক বড় ক্ষত। এরা সে ব্যাথার কী বোঝে, এক-একটা গণ্ডার। পরীর বাড়িতে একমাত্র আমার যাওয়া-আসা আছে, তাই এরা আমাকে অনেকটা সমীহ করে। পরীর ছোটোভাই এবার মাধ্যমিক দিচ্ছে, তাকে অঙ্কটা পড়াই আমি। আমাদের মধ্যে, ছটকু তো পানওয়ালা, গো-মুখ্যু, আর বিমান অর্ধশিক্ষিত, টাকাওয়ালা বাপের সুপুত্তুর, স্কুলের দশক্লাসের গণ্ডি পার হয়নি। রতন গ্র্যাজুয়েট, কিন্তু ওর বাবার সোনার দোকানে বসে। আমি আর মন্টু একসঙ্গে আশুতোষ কলেজ থেকে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পাশ করে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাইটে এম বি এ করেছি। গত ছ-মাস ধরে বেকার।

বিমানকে কিছু না বলার আরো কারণ আছে। ওর বাবা শালা প্রমোটার, অনেক কালো টাকায় পকেট সব সময় গরম। কারণে-অকারণে ধার দেয়, রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ায়। এক্ষুণি দরাজ গলায় বলল, ‘চল, নবীনায় ম্যাটিনি শো-টা মেরে আসি।’ বিমান থাকলে আমরা কেউ পকেটে হাত দিই না। আজ আমার মুড নেই। বললাম,
‘না রে, তোরা যা, আমি আজ যেতে পারব না।’
‘কেন রে, তোর কী রাজকার্য আছে?’
‘তোরা তার কী বুঝবি রে, আকাট মুখ্যুর দল! আমার আজ একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে।’

বেশ গর্বের সঙ্গে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে আমি উল্টোদিকে হাঁটা দিলাম। মনটা শালা এখন নিম-তেতো। আমার তো সবই ছিল, শিক্ষা, পরিচয়, চেহারা – সবাই তো বলে আমাকে নাকি অনেকটা হৃত্বিকের মতন দেখতে। চাকরিও পেতে চলেছি। তবে আমি শালা বিমানের থেকে কম কিসে? যদি না ভগবান মেরে না রাখত। শালার ভগবানের কি আর কোনো কাজ নেই, লোক বেছে বেছে বাঁশ দেওয়া। আমার ইন্টারভিউ দুপুর আড়াইটে। এখন বাজে দশটা চল্লিশ, হাতে অনেক সময়। ঘুরে আসব নাকি কবিরাজের কাছ থেকে? শুনলাম, বেটার ছেলে ধন্বন্তরী, একটা ট্রাই নেব নাকি!

‘আরে, আরে, কে রে ধাক্কা মারছিস!’ চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি, মন্টুটা দাঁত কেলাচ্ছে – হাঁফ নিয়ে বলল, ‘কোথায় ইন্টারভিউ রে তোর! কিছু বলিস নি তো আগে!’ আমি ভয়ানক মুখ করে বললাম, ‘যাচ্ছি একটা শুভ কাজে, দিলি তো বাধা শালা আহাম্মক। মারব পাছায় এক লাথি।’ মুখ কাঁচুমাচু করে মন্টু, ‘রাগ করছিস কেন রে। জানিস তো আমার বাড়ির অবস্থা। ছোট বোনটা শালা রোজ বিনুনি দুলিয়ে, ব্যাগ ঝুলিয়ে আপিস যাচ্ছে। প্রেস্টিজে আলকাতরা। তোর ছোটমামা তো ইনফোসিস’য়ে – একটু বলিস না আমার হয়ে। তুই না আমার হাফ-প্যান্টের ইয়ার! স্বপ্ন-টপ্ন সব ছাইরঙা হয় গেছে রে, রং-টং সব মুছে যাচ্ছে।’ থালার মতন গোল মুখটাকে যথাসাধ্য করুণ করল।

আমি চোখ সরু করে দেখলাম ওকে। বটে, এই নাকি স্বপ্নবিলাসী। বেটাচ্ছেলে ছ-মাসেই টেকনিকালার থেকে সাদা-কালোতে নেমে এসেছে। জীবনে রঙ না থাকলে স্বপ্নে দেখে না যে, সে আবার স্বপ্নের, অনুভবের রেলা নেয়।

‘আমাকে দেখ, দ্যাখ শালা আমার দিকে তাকিয়ে। আমি স্বপ্নে পরীকে দেখেছি, শালা আমার বিছানায়। আমি পেরেছি রে, স্বপ্নে পেরেছি রে শুয়ার। ঘুমের থেকে উঠে তোদের মতন পায়জামা কাচতে দিতে হয় না রে আমায়, তবু আমি স্বপ্নে পেরেছি রে শালা।’

মন্টুর ঝুলে পড়া হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে একরকম আত্মপ্রাসাদে মনটা ভরে উঠল। বোঝো এখন, ভাব শালা, ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ কর। আমার মতন ইয়েরা স্বপ্নে করতে পারে কিনা জেনে নে। আমি তো শালা বলেই খালাস। পিছন ফিরে না তাকিয়ে হনহনিয়ে বাসস্টপের দিকে চললাম। বাঁশদ্রোনীর মহুয়া সিনেমা হলের পিছনের গলিতে বাড়ি, সেখানেই রোগী দেখেন। যাই একবার লাক ট্রাই করে আসি।

মন্টুঃ

যাচ্চলে। কিসের থেকে কী! এত রাগের কী আছে রে বাবা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার ছোটবেলাকার বন্ধু, কিছু আর জানতে আমার বাকি নেই ওর বিষয়ে। করুণা হল আমার, রাগ এল না। আমি জানি তো শান্তনুর ব্যাথাটা কোথায়। বেচারা, স্কুলের শেষের দিকে যখন আমাদের সকলের ঠোঁটের উপর হাল্কা গোঁফের রেখা উঠছে, শরীরের বিশেষ স্থানে বিশেষ আবেদন, গলার স্বর ভাঙা ভাঙা, শান্তনু কেমন যেন অন্য রকম। মেয়েদের শরীর নিয়ে আলোচনায় যোগ দেয় না, মনমরা মতন হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

একদিন আমি চেপে ধরলাম, ‘কী হয়েছে রে শান্তনু, এমন একা একা হয়ে ঘুরিস কেন? বাড়িতে কোন ঝামেলা হল নাকি আবার?’

শান্তনুর বাড়িতে নানা অশান্তি। ওরা চার ভাইবোন। ওদের বাবা ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন, কালীঘাট ক্লাবে খেলতেন। একটা প্র্যাকটিস ম্যাচে বুক দিয়ে বল আটকাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। অনেকদিন বিছানায় শোয়া ছিলেন, কোনরকম রোজগার নেই, সংসার চলে না। সেই সময় ওদের বাবার বন্ধু, শান্তনুর পল্লবকাকা, এসে ওদের সংসারের হাল ধরলেন। ওদের বাড়িতেই থাকতেন, ওদের মা’কে বৌদি বলে ডাকেন। ভাইবোনেদের মধ্যে শান্তনু সবথেকে বড়, তাই ওর অনেক কিছুই চোখে পড়ে যা বাকিরা বোঝে না। শান্তনু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারল, ওদের মা আর পল্লবকাকার মধ্যে একটা অন্য রকম সম্পর্ক আছে, আর সেই নিয়ে বাবার সঙ্গে মার অনেক কথা কাটাকাটিও শুনতে হয়েছে তাকে রাত্রিবেলায়।

এখন আমার মনে হয়, হয়ত মাসীমার কিছু করার ছিল না। চারটে ছেলেমেয়ে, অসুস্থ স্বামী, সংসার চলবে কী করে? হয় ঝি-গিরি করতে হত নয় তো রাস্তায় নামতে হত, তার চেয়ে অনেক সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন মহিলা। কিন্তু এমন অপমানের জীবন মেসোমশাই বেশীদিন সহ্য করতে না পেরে একদিন গলায় দড়ি দিলেন। কিছুদিন পাড়ায় লোকেদের ফিসফাস, ছিছিক্কার, তারপর একদিন থেমে গেল, কিন্তু একটি সরল-সোজা কিশোর মনে একটা বিরাট ধাক্কা। সে সময় শান্তনু বহুদিন আমাদের বাড়িতে রাত কাটিয়েছে। স্কুল-ফেরত আমাদের বাড়ি চলে আসত। ধীরে ধীরে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছিল, কিন্তু কেমন যেন অন্তর্মুখী, তিক্ত আর অসহিষ্ণু।

‘আচ্ছা মন্টু, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব, কারুকে বলবি না তো?’
‘কী কথা রে?’
‘কেন রে ব্যাটা, কী কথা, না বললে প্রমিস করবি না?’
‘কী মুশকিল, এত চটে যাস কেন। এমনি জিজ্ঞাসা করলাম, না বলব না কারুকে, কী হয়েছে বল না।’
‘শোন, শুধু তোকে বলছি, আর কেউ জানে না, যদি কারুকে বলেছিস, তোকে কিন্তু গলা টিপে মেরে ফেলব বলে দিচ্ছি।’

এবার আমার ভয় এসে গেল। ‘কেন রে, তুই কি কোনো মার্ডার-টার্ডার প্ল্যান করেছিস নাকি! না ভাই আমাকে বলতে হবে না, তুই আর কারুকে বল বরঞ্চ। আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি, ক্রিমিনাল নই। আমার ওপর আমার মা, বোন তাকিয়ে আছে, তুই আর কিছু বলিস না।’ ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। আমি একটু ভীতু প্রকৃতির মানুষ।

শান্তনু কেমন অবাক হয়ে আমার দিয়ে তাকিয়ে রইল। ‘তুই ভাবলি কী করে আমি কারুকে মার্ডার করতে পারি? যাঃ শালা, ভাগ এখান থেকে, তুই আমার বন্ধু হবার যোগ্যই নোস। ভিতুর ডিম কোথাকার, স্বপ্ন দেখেই জীবন কাটিয়ে দে, জীবনের কঠিন সমস্যার কথা তোকে কি বলব, আমিই পাগল যে তোর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিলাম!’

এবার আমি শান্তনুকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে রে, আমাকে ক্ষমা করে দে। বল না। তুই তো জানিস তোর কোন কথা আমি কারুকে কোনদিনও বলিনি। বল, জানিস না?’

শান্তনু কেমন ভাবালু মুখে তাকিয়ে ছিল। এবার চোখ মাটির দিকে নামিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর পুরুষাঙ্গ কি শক্ত হয়?’ প্রথমটা আমি ঠিক বুঝিনি, কিছুক্ষণ ওর দিয়ে তাকিয়ে থেকেও যখন দেখলাম শান্তনু মাটির থেকে চোখ তোলে না, হঠাৎ কথাটার অর্থ আমাকে যেন চাবুক মারল? ‘কেন রে, তোর বুঝি… মানে তুই কি…’ আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না।

‘হ্যাঁ, আমার মনে হচ্ছে, আমি কোনদিন পারব না…’

আমি হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে বললাম, ‘না না তা কেন ভাবছিস! হয়ত তোর এখনো সময় হয়নি, মানে অনেকের তো পরেও হয়। তুই ডাক্তার দেখা না।’

কোন কথা না বলে শান্তনু ফিরে গেল। ওর যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে আমার ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল – বেচারা!

এ বয়সে এসে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, শান্তনুর গণ্ডগোলটা হয়ত শারীরিক নয়, মানসিক। ছোটবেলা থেকে যে এত কিছু দেখেছে, এমন কি এক রাত্রে নাকি পল্লবকাকা আর মাসীমাকে একসঙ্গে এক বিছানাতেও দেখেছিল, সেই রাত্রির পরে পনেরো দিন বাড়ি ফেরেনি রাত্রি বেলায়। আমার মা-বাবা খুব স্নেহ করতেন, কিচ্ছুটি জিজ্ঞাসাও করেন নি, বাড়ি ফিরতেও বলেন নি। একদিন নিজে থেকেই বাড়ি ফিরেছিল। আমার খুব সন্দেহ হয়, অনেকবার ভেবেছি ওকে মানসিক ডাক্তার দেখাতে বলব, কিন্তু যা রাগী, বলতে সাহস হয় নি।

হ্যাঁ, ‘বেচারা…’, আমি এখনও ওর অপসৃয়মান শরীরের দিকে তাকিয়ে এই কথাই ভাবছিলাম।

পরীঃ

শান্তনুদা কেমন ভালমানুষের মতন থাকে। দেখে মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানে না। কিন্তু আমি জানি, সব ক’টা ছেলের মধ্যে সব চেয়ে চালু ছেলে। ভাইকে পড়াতে আসে যখন, কতবার যাই ঘরে, চা নিয়ে, জলখাবার নিয়ে, মাঝে মাঝে আমার নিজের অঙ্কটা দেখাবার ছল করে, মুখের দিকে তাকিয়েও দেখে না। লাজুক লাজুক মুখে টেবিলের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। কেন বাবা আমি, কি বাঘ না ভাল্লুক? নাকি আমাকে দেখতে খারাপ? রাগে গা আমার জ্বলে যায়। দেখ বাবা বিশ্বামিত্র, তোমার ধ্যান আমি ভাঙবই। এ আমার প্রতিজ্ঞা। ঈশশ… আমাকে উপেক্ষা!

ছটকুর পানের দোকানের সামনে আড্ডা মারা হচ্ছে। কী করে যে ওর মতন এমন শিক্ষিত, মার্জিত ছেলে বিমানের মতন একটা গুণ্ডার সঙ্গে আড্ডা মারে, কে জানে! বিমান তো আমাকে বিরক্ত করে মারল। বদমাশ কোথাকার। ওর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করা যায়, শারীরিক হওয়া যায়, কিন্তু প্রেম – ম্যা গো! বাবার টাকা আছে, মনে করেছে সবাই কে টাকা দিয়ে কিনে নেবে। মন্টুদাকে ধরতে হবে, ওর সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব। মন্টুদারও যেন কেমন কেমন ভাব। ছোটবেলা থেকে দাদা বলে ডাকি, দাদার মতনই ভাবি, ওর বোন লাবনী যদিও আমার থেকে দু-বছরের বড়, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর কাছেই শান্তনুদার সম্পর্কে অনেক কথা জানতে পারি। ওর জন্য আমার ভারি কষ্ট হয়। কেমন দুঃখের জীবন। আমার ভীষণ ইচ্ছে করে ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করি, ভালবাসি, ওর সব দুঃখ, সব কষ্ট ভাগ করে নিই। আমার শান্তনু। একদিন ওকে আমার করে ছাড়বই। আমার জেদ তো জানে না।

ঐ তো শান্তনু আসছে এদিকে, ডাকব নাকি? ‘ও শান্তনুদা, কোথায় যাচ্ছ?’ একবার তাকাও, এখানে তো আর আমাকে অস্বীকার করতে পারবে না বাবু, মনে মনে বলি।
ওর থতমত ভাব দেখে আমার ভীষণ মজা লাগছে।
‘এই তো, একটা ইন্টারভিউ আছে।’
‘কটার সময়?’
‘আড়াইটে।’
‘বাবা, সে তো অনেক সময় বাকি। চল না, চা খাবে? এস না প্লীজ। তোমার ইন্টারভিউ কোথায় গো?’
‘ক্যামাক স্ট্রীট।’
তাই নাকি? চল না আমরা জীবনকাকুর দোকানে চা-তেলেভাজা খেয়ে নিই। আমি সেই সকালে বেরিয়েছি, জানো! ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেছে। এসো এসো।’

শান্তনুর হাতটা ধরে এগিয়ে গেলাম। বাপরে বাপ কি ঠাণ্ডা হাত। এই বয়সী ছেলের এমন ঠাণ্ডা হাত হয় নাকি?

আমাদের দেখে জীবনকাকু একটু অবাক হয়ে গেল।
‘কিরে, তোরা দুজনে? কী চাই?’

‘জীবনকাকু ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেছে। শান্তনুদাকে আমি ধরে এনেছি, ভাইকে পড়াতে গেছিল’, একটু মিথ্যে কথা বলতে হল, আড়চোখে দেখলাম শান্তনুকে, মুখটা কি একটু লাল? ‘বাড়িতে মা ছিল না, চা-পাতা শেষ। ভাবলাম তোমার দোকানে চা খেয়ে যাই। এক প্লেট তেলেভাজাও দিও।’

আমি একতরফা অনেক কথা বলে গেলাম। তিনি নিরুত্তর। বিরক্তির একশেষ। চা তেলেভাজা শেষ, এবার কি করা। রাস্তায় নেমে একটু চাপা হেসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কী হল কী, এত চুপচাপ। আমি কি এতই খারাপ যে একটা কথাও বলতে ইচ্ছে করে না?’ এবার দেখলাম পাথর গলেছে।

‘না না, তা কেন। কোনদিন তো এরকম কাছে আসো নি, তাই অবাক হয়ে গেছিলাম। তার উপর তুমি আবার বিমানের ইয়ে। বিমান রেগে গেলে আবার খুব মুশকিল কিনা।’
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। ‘কে বলেছে আমি বিমানের ইয়ে? কে বলেছে বল শীগগিরি!’
‘আরে আরে এত রাগ করছ কেন। ছটকুর দোকানে শুনলাম কিনা, তাই বললাম। না হলে তো ভাল।’
‘কেন, ভাল কেন?’ আমার হাসি পেয়ে গেল।
‘না মানে, গুণ্ডা মতন তো, তাই বলছি আর কি।’ আমতা আমতা করছে দেখে আমার কষ্ট হল বেশ। ‘ঠিক আছে। এবার থেকে কেউ এরকম বললে বলে দিও, একদম বাজে কথা। কি, বলবে তো?’
শান্তনু নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
‘তোমার ইন্টারভিউ তো এখনও অনেক দেরী আছে, আমাদের বাড়ি চল না, একটা অঙ্ক এমন আটকে গেছে কিছুতেই পারছি না।’ শান্তনুর কোন আপত্তি না শুনে জোর করে নিয়ে এলাম বাড়ি। আমাদের পড়ার ঘরটা চিলেকোঠায়। সোজা উপরে নিয়ে গেলাম। উপরে উঠবার সময় দেখলাম মা রান্না ঘরে ব্যস্ত। বাবা তো অফিসে। ছোট ভাই স্কুলে।

ঘরে ঢুকে আমি শান্তনুকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। ভয়ানক চমকে নিজে ছাড়িয়ে আমার দিকে ফিরে তাকাল, ‘কী করছ?’ ‘কী আবার, একটা মেয়ে আর একটা ছেলে যা করে তাই।’ বলেই আমি শান্তনুর মুখটা টেনে নামিয়ে আনলাম, মুখটা উঁচু করে একটা গভীর চুমু দিলাম ওকে, আমার হাতটা ধীরে ধীরে ওর জামার বোতামগুলো খুলে দিচ্ছিল।

লক্ষ্য করলাম, ওর শরীর ক্রমশ নরম হয়ে আসছে, একেবারেই বিমানের মতন নয়। এরকম অবস্থায় বিমানের নিম্নাঙ্গ শক্ত হয়ে আমার শরীরে আঘাত করতে থাকে। বিমানের হাত অস্থির হয়ে ওঠে আমার সারা শরীর জুড়ে। কিন্তু এ কী, শান্তনু কেমন নিস্তেজ, নির্বাক দাঁড়িয়ে। আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেলাম। শান্তনুর মুখটা ফ্যাকাশে, নীলচে হয়ে গেছে। আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। মাটির দিকে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

‘কী হয়েছে শান্তনু! অন্য কারুকে ভালবাস?’
মাথা নাড়ল, ‘না, আমি… আমি পারি না…’

আমার সর্বাঙ্গ ঘৃণায় রি রি করে উঠল। ‘ছিঃ! চলে যাও এখান থেকে, চলে যাও!’ দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলাম।

কিছু না বলে মাথা নিচু করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। আমার বুকের ভিতর থেকে একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। মনে মনে বললাম, ‘বেচারা।’

প্রতাপ সেন চৌধুরী

 

মানুষের জীবনে অতীতে এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যা কখনো কখনো তার ভবিষ্যৎ জীবনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। এরকমই একট ঘটনা প্রদীপের জীবনে ঘটেছিল।

*****

প্রদীপ চ্যাটার্জি, বর্তমানে বয়স ৬৫। দুর্গাপুর ইস্পাত প্রকল্প থেকে গত পাঁচ বছর হোল অবসর নিয়েছে। সফল মানুষ, এক মেয়ে ও এক ছেলে। চাকরী থাকতেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। ছেলে অপেক্ষাকৃত ছোট, বিয়ে হয়নি এখনো, কলকাতায় থেকে চাকরী করে।

চাকরী থাকাকালীন প্রদীপ বর্ধমানে বাড়ীও করেছে। বর্ধমানে বাবর বাগ-এ বেশ ফাঁকা জায়গাতেই বাড়ীটা। সামনে বড় রাস্তা। দোতলা বাড়ী, নীচে গ্যারেজ। বেশ শান্তিতেই স্ত্রী সুমিতাকে নিয়ে ছিল। অবসরের পর সময় কাটানোর জন্য বই পড়া, লেখা আর ইন্টারনেটকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু একদিন –

প্রদীপ হঠাৎ করেই দেখেছিল ছেলেটাকে। চাকরী থাকতে একটা গাড়ী কিনেছিল – টাটা ইণ্ডিকা। গাড়ীটা অনেকদিন সার্ভিসিং করানো হয়নি বলে একদিন সকালেই টাটা মটরস এর সার্ভিসিং সেন্টারে নিয়ে গেল গাড়ীটাকে। গাড়ীটাকে দাঁড় করাতেই যে ছেলেটি প্রথমেই এগিয়ে এল তাকে দেখেই চমকে উঠল সে। ছেলেটি যেন তারই ছোটবেলার প্রতিমূর্তি। কি করে এমন হল? – একটু আনমনা হয়ে গেল সে।

হঠাৎ ছেলেটির কথায় সম্বিত ফেরে। ‘স্যার, গাড়ীর কি হয়েছে?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে। আনমনা হয়েই প্রদীপ বলে, ‘সার্ভিসিং করতে হবে।’ ছেলেটির পেছনেই মালিক তারাপদ বাবু আগিয়ে এলেন, উনি বহুদিনের পরিচিত, বললেন, ‘কি ভাবছেন? ওকে আগে দেখেননি তাই? ও আমার কাছে মাস তিনেক হল এসেছে, ওকে নিঃসঙ্কোচে আপনি গাড়ী দিতে পারেন, ও খুব ভাল মিস্ত্রী।’

ছেলেটিকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়ে মালিকের সামনে গিয়ে বসল সে। ‘চ্যাটার্জি সাহেব, আপনি তো বহুদিন পরে এলেন, বসুন, চা খান।’ চা খেতে খেতে প্রদীপ তারাপদ বাবুর কাছ থেকে জানল যে ছেলেটি নাকি অনেক দূর থেকে আসে, শিক্ষিত ছেলে, স্কুল ফাইনাল পাশ। অটোমোবাইলে আই টি আই পাশ, টাটাতে ট্রেনিংও করেছে। নাম বাসুদেব। এর মধ্যেই বাসুদেব বলে গেল গাড়ী হতে দু’দিন সময় লাগবে।

‘তাহলে আজ আসি,’ বলে সে রিক্সা নিয়ে বাড়ী চলে এল। বাড়ীতে এসে খবরের কাগজটা নিয়ে বারান্দায় এসে বসে। কিন্তু কাগজ পড়ায় মন না দিয়ে সে ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে নিজের যৌবনের চেহারাটা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে – লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট, দোহারা চেহারা, চুল কোঁকরানো, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, নাক মুখ চোখা, সব কিছু মিলিয়ে এক স্বাতন্ত্র্য ছিল তার চেহারায়। এইজন্য কলেজ জীবনে সবার প্রিয় ছিল, ইউনিয়নের নেতাও ছিল সে। আজ বাসুদেবের মত একটা আদিবাসী ছেলের মধ্যে সেই একই ছবি; কি করে সম্ভব? এরইমধ্যে সুমিতা তাড়া দিয়ে গেল, ‘এবার ওঠ, বেলা তো হল! স্নান খাওয়া করতে হবে তো, নাকি?’ ঘড়িতে দেখল প্রদীপ একটা বাজে। কাগজ একপাশে সরিয়ে রেখে উঠে স্নান করতে গেল সে। অবসরের পর থেকে দুপুরে একটা ভাতঘুম দেবার অভ্যাস হয়ে গেছে।

*****

আজ শত চেষ্টা করেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না। বার বার ছেলেটার চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। কে এই বাসুদেব? পরের দিন সকালে আর সে স্থির থকতে না পেরে আবার সেই সার্ভিস সেন্টারে গেল। তারাপদ বাবু দোকানে ছিলেন না, বাসুদেবই এগিয়ে এসে বলল, ‘আজ তো গাড়ী হয়নি স্যার, কালকেই তো বললাম দু’দিন লাগবে।’ প্রদীপ হেসে বলল, ‘গাড়ী নিতে আসিনি, তোমার সঙ্গে আলাপ করব বলে এলাম।’ বাসুদেব কি বুঝল কে জানে, একটা টুল এনে সামনে বসল। সে ওকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কোথায় থাক?’ বাসুদেব বলল, ‘পানাগড়ের কাছে টেন্ট গেটে।’ ‘তোমার বাবার নাম?’ ‘সহদেব মুর্মু। বাবা মারা গেছেন। মা ওখানে সুইপারের কাজ করেন।’

এই কথা বলে সে উসখুশ করতে লাগল। প্রদীপ বুঝতে পারল মালিক আসার সময় হয়েছে, কাজ করতে হবে, তাই ও ওরকম করছে। প্রদীপ ওকে ছেড়ে দিল – বলল, ‘যাও, কাজে যাও।’

*****

বাড়ী চলে এল সে। বাসুদেবের দু’টি কথা তার কানে বাজতে লাগল – টেন্ট গেট আর সহদেব। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সুমিতা বলল শপিং করতে যাবে। তবে প্রদীপকে যেতে হবে না, ও পাশের বাড়ীর মহিলার সঙ্গেই যাবে। প্রদীপ একটু স্বস্তি পেল কারণ ও নিশ্চিন্তে একটু ভাবতে পারবে।

শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে লাগল, এই কি সেই সহদেব? স্মৃতির পাতা থেকে পঁচিশ বছর আগের একটা রাতের কথা তার চোখের সামনে ভেসে এল। তখন দুর্গাপুরে ইস্পাত প্রকল্পে কাজ করত।

সেদিন ছিল ছুটির দিন, পরের দিন ছিল নাইট ডিউটি। পৈতে উপলক্ষে এক সহকর্মীর বাড়ী গলসীতে নেমন্তন্ন ছিল। অল্প বয়েস, সবসময় বাইক নিয়েই যেত। গলসীতেও তাই গিয়েছিল। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে বেরোতে প্রায় সন্ধ্যা। ফেরার জন্য প্রদীপ বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তখন জিটি রোড হাইওয়ে হয়নি। তাই বেশী জোরে গাড়ী চালানো সম্ভব ছিল না। আস্তে আস্তেই আসছিল সে। কিন্তু পারাজ আসতে না আসতেই কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে এল। শুরু হল প্রচণ্ড ঝড়, তবুও কোনরকমে সে এগিয়ে যেতে লাগল, ভাবল যদি পানাগড় পর্যন্ত যেতে পারে তবে নিশ্চিত আশ্রয় পাওয়া যাবে। কিন্তু বিধি বাম, টেন্ট গেট যেতে না যেতেই বিদ্যুৎ চমকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। ঠিক টেন্ট গেটের কাছেই একটা ছোট চায়ের দোকান অর্ধেক ঝাঁপ নামানো ছিল। গাড়ীটাকে দোকানের পাশে দাঁড় করিয়ে ঐ ঝাঁপের তলায় মাথা গলিয়ে দিল। দোকানদার আদিবাসীই হবে বোধহয়, বলল, ‘বাবু আরও ভিতরপানে আসুন, ওখানে জল আটকাবেক নাই।’ প্রদীপ ভেতরে ঢুকে এল, ঢুকে দেখল ও আর দোকানদার ছাড়াও আরেকজন আছে, এক অল্পবয়সী আদিবাসী বউ, দোকানদারের বউই হবে। বলল, ‘লক্ষ্মী, বাবুকে চা দে, একেবারে ভিজে গেইছে।’ লক্ষ্মী চা দিয়ে গেল। সে দেখল দোকানদার মাঝবয়সী হলে কি হবে, বউ তার যুবতী। এবার ভাল করে তাকে দেখল প্রদীপ। একজন শিল্পী নিখুঁত ভাবে কালোপাথরে খোদাই করে একটা নারীমূর্তি তৈরী করলে যেমন হয়, ঠিক তেমনি সে। চেহারায় যৌবনের জোয়ার, কষ্ঠিপাথরের মত কালো শরীর চকচক করছে, ঢিলে করে পড়া ব্লাউজের উপর আঁটসাট করে লাল শাড়ী পড়া, নিখুঁত নাক মুখ চোখ, একরাশ চুল খোঁপা করে বাঁধা। চেনা জগতের বাইরে এক অনাবিল বন্য সৌন্দর্য দেখছিল সে। নির্লজ্জের মত তাকিয়ে আছে দেখে লক্ষ্মী একটু হাসল, ‘বাবু, বিস্কুট!’ ঘাড় নেড়ে সায় দিতে হাসতে হাসতেই বিস্কুট দিয়ে গেল সে। আবার ও দেখল প্রদীপ দাঁতের সাড়িও নিখুঁতভাবে সাজানো, যেন একরাশ মুক্তো ঝরে পড়ল।

বাইরে উঁকি মেরে দেখল তখনো সমানে বৃষ্টি পড়ছে। পকেটে ঘড়ি ছিল, বার করে দেখল রাত আটটা বাজে।

এর মধ্যে দোকানদারের সঙ্গে আলাপ করে জানল তার নাম সহদেব মুর্মু, আর্মিতে সুইপারের কাজ করে। বাইরের দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখল। মিশকালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে জিটি রোড, ঐ বৃষ্টির মধ্যেই অন্ধকারের বুক চিরে দু’একটা লরী ধেয়ে চলেছে। আর কোন যানবাহন চলছে না। প্রদীপ কি করবে বুঝতে পারল না।

সহদেবের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল, দেখে খারাপ লোক বলে মনে হল না। সহদেবকে বলল, ‘এখানে রাত্রীটা থাকার মত কোন ব্যবস্থা হবে?’ সে কিছুক্ষণ ভেবে জানাল যে আশেপাশে কোন হোটেল নেই, কষ্ট করে থাকতে পারলে টেন্ট গেটের ভিতরে তার কোয়ার্টার, পাশের কোয়ার্টারে এক বিহারী থাকে, কার্পেন্টার, দেশে গেছে। সেখানে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। যাই হোক এক রাতের তো ব্যাপার, চলে যাবে – এই ভেবে সে সহদেবকে একশ’ টাকার নোট দিল, বলল, ‘সেই ব্যবস্থাই কর।’ সহদেব বলল, ‘একটুকুন বসুন বাবু,’ এই বলে দোকান বন্ধ করার জন্য সব গুছিয়ে নিলো।

লক্ষ্মীও হাতে হাতে সাহায্য করল। দোকান বন্ধ করে ওরা দু’জন আগে আগে চলল, প্রদীপ গাড়ী চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তাই গাড়ী টেনে নিয়ে ওদের পিছন পিছন চলল।

গেট দিয়ে ঢুকে দেখল চারিদিক অন্ধকার। বোধহয় পাওয়ার নেই, টেন্টের রাস্তার বাতিগুলোও জ্বলছে না। তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। কিছুসময় এইভাবে চলার পর সহদেব বলল, ‘এই যে বাবু, এই হেথা!’ অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হচ্ছিল না। আচমকা বিদ্যুৎ চমকে ওঠায় প্রদীপ দেখল একটা ব্যারাকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে দেশলাই জ্বেলে ওর ঘরের চাবি খুলল, মোমবাতি জ্বেলে চাবি দিয়ে পাশের ঘর খুলে দিল। মোমবাতিটা সহদেব ওর হাতে দিয়ে বলল, ‘বাবু, ঘরে ঢুকে যান।’ ইতিমধ্যে লক্ষ্মী ওদের ঘরে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দিয়েছে। মোমের আলোয় এবার চারিদিক দেখল সে। ব্যারাক বলতে যা বোঝায় তাই – বারান্দা কমন। পাশাপাশি চারটি ঘর, কোণেরটা সহদেবের, তার পাশেরটাতে ওকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, আর তার পাশে আরো দুটি। সব ঘরই তালাবন্ধ।

প্রদীপ ঘরে ঢুকে দেখল একটা দড়ির খাটিয়া আছে, আসবাবপত্র বলতে কিছুই নেই। পেছন দিকে একটা দরজা, দরজা খুলে দেখল একপাশে একটু রান্নার জায়গা, সেখানে কিছু বাসনপত্র স্টোভ ইত্যাদি অন্যদিকে বাথরুম। বাইরে তাকিয়ে দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে। চারিদিকটা কেমন গুমোট হয়ে আছে।

পাওয়ার এসে গেলে রাস্তার লাইটগুলো জ্বলে উঠলো। ঘর বারান্দা সব আলো সুইচ টিপে জ্বেলে দিল সে। গাড়ীটা মোছা দরকার। তাড়াতাড়ি দোকানে ঢুকে পড়েছিল, তাই জামা প্যান্ট তেমন ভেজেনি। সে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলে গেঞ্জী আর বারমুডা পড়ে বারান্দায় গাড়ীটাকে তুলে আনল, তারপর ডাস্টার বার করে মুছতে লাগল। মুছতে মুছতে খেয়াল করল বোতল আর গ্লাস নিয়ে সহদেব বসে গেছে। ওকে দেখে সহদেব বলল, ‘কি বাবু, চলবে নাকি একটুকুন?’ হাতের ইশারায় সে না বলল। গাড়ী মোছা হয়ে গেলে বাস্কেট থেকে ব্যাগ বার করল, একটা ছোট তোয়ালে আর একটা সাবান তার ব্যাগে সবসময় থাকে। সাবান তোয়ালে নিয়ে সে বাথরুমে গেল। সে যখন স্নান করে বেরল, দেখল পরিপাটি করে খাটিয়াতে বিছানা করে দিয়েছে লক্ষ্মী। এবার লক্ষ্মী একটা লুঙ্গি দিয়ে ফিক্‌ করে হেসে চলে গেল। চোখাচোখি হলেই ও হেসে দিচ্ছে। ওর এই ব্যবহার বেশ উপভোগ করছিল প্রদীপ। লুঙ্গিটা পড়ে বেশ জুত করে বিছানায় বসে সে একটা সিগারেট ধরাল।

এবার সহদেবের গান শোনা গেল – ‘বড়নোকের বিটিলোক লম্বা লম্বা চুল – এমন মাথায় বেন্ধে দিব…’ প্রদীপ বুঝল সহদেবের নেশা ধরেছে। রাত দশটা বাজল। জাতে মাতাল, তালে ঠিক। হেঁকে বলল, ‘লক্ষ্মী-ই বাবুর খাবার দিয়ে আয়।’ লক্ষ্মী এসে আসন পেতে, জল গড়িয়ে খাবার দিয়ে গেল। ওরা সাঁওতাল না মুন্ডা জানে না প্রদীপ, কিন্তু অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা দেখে ভালই লাগল ওর। ডিমের কষা আর রুটি, সঙ্গে পেয়াঁজ, লংকা আর আচার। খিদেটাও বেশ চাগিয়ে উঠেছিল। বসে খেতে লাগল। এরমধ্যে লক্ষ্মী শুধিয়েছে আর রুটি লাগবে নাকি, সে ইশারায় দিতে বারণ করেছে। রাত্রীবেলা চারটের বেশী রুটি খায় না। খাওয়া হলে মুখ ধুয়ে আবার বিছানায় বসল সে। আর একটা সিগারেট ধরাল সে। গুমোট আবহাওয়ায় প্রচণ্ড গরম করছে। উঠে পাখাটা চালাল। এখনো এঁটো বাসন নিতে এল না লক্ষ্মী। ভাবল ধুয়ে রাখবে কিনা। কিন্তু ক্লান্তিতে আর ইচ্ছে করল না, শুয়ে পড়ল সে। দরজাটা ভেজানো ছিল। মাঝ রাতে দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আবার বিদ্যুতের আওয়াজ আর ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

প্রদীপ খেয়াল করল, দরজা খুলে পায়ে পায়ে ভিতরে এগিয়ে আসছে এক নারীমূর্তি, তাকিয়ে দেখল সে আর কেউ না, লক্ষ্মী। পিঠে এলানো চুলের রাশি, সদ্যস্নাত, প্রায় নিরাভরণা, শুধু একটা হাল্কা রঙের শাড়িতে উন্মত্ত যৌবন ঢাকা। এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসল সে, ‘একি তুমি! এতো রাত্রে?’ গুটি গুটি এসে ঠিক পায়ের কাছটিতে বসল লক্ষ্মী। বলে, ‘বাবুসাহেব, আপুনির কাছে একটা চাইবার আছে।’ ‘কি চাও?’ বলে সে। লক্ষী যা বলল, তা হল – পাঁচ বছর ওদের বিয়ে হয়েছে। সহদেব এখনো কোন সন্তান দিতে পারেনি ওকে। তাছাড়া স্বামী স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কও ওদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি কখনো, কারণ সহদেব মদ, আর ডিউটি ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। দোকানে যায় মদের টাকায় টান পড়লে। নয়ত লক্ষ্মীই দোকান চালায়। সুখ কোনদিন পায় নি সে। ইতিমধ্যে আর্মির ডাক্তারদিদি তাকে পরীক্ষা করে বলেছে, যে বাচ্চা না হবার মত কোন দোষই নেই ওর। ওদের সমাজের প্রায় সব পুরুষই এরকম মাতাল দুশ্চরিত্র, তাই তার সন্তান ওরকম হোক তা সে চায় না। তার মত পুরুষের সন্তান সে ধারণ করতে চায়।

এইসব কথা বলতে বলতে লক্ষ্মী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, ‘বাবু আমাকে ফিরায়ে দিবেন না।’ এই বলে এক আকুতি নিয়ে সে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রদীপ প্রথমে চমকে উঠে বলল, ‘না না, এ কি করে হয়? তুমি চলে যাও! তাছাড়া সহদেব…’ কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই সে বলল, ‘আজ আমদানীটো ভালই, উ এখন মাল খেয়ে হুঁশ নেই, কাল সকালের আগে উঠবেক লাই।’ অশ্রুসজল চোখে সে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। হালকা বিদ্যুতের আলোয় ওর ঐ মুখ দেখে মায়া হল প্রদীপের। আস্তে আস্তে ওর মুখটা তুলে ধরতেই লক্ষ্মী ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওর চুলের উগ্র তেলের গন্ধ আর শরীরের বন্যতায় সে মাতাল হয়ে গেল। এক অনাস্বাদিত অনুভূতিতে তার দেহমন ভরে উঠল। এরপর প্রদীপ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না – এক আদিম খেলায় ওরা মেতে উঠল। পরপর তিনবার – চরম পরিতৃপ্তি না পাওয়া অবধি লক্ষ্মী নিজেকে উজাড় করে দিল। আর প্রদীপ পেল এক অজানা স্বাদ, এক অচেনা অনুভূতি।

সবশেষে লক্ষ্মী নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ওকে একটা প্রণাম করল। তারপর দ্রুত পায়ে চলে গেল। প্রদীপের মনে হল ভালোবাসা নয়, যৌন আকর্ষণ নয়, যেন দেবতার কাছে লক্ষ্মী নিজেকে সঁপে দিল শুধু একটা সন্তানের আশায়।

সে জানে না ওর আশা সে পুরণ করতে পারবে কিনা, আর ভাবতে পারল না সে। পরিতৃপ্ত ক্লান্ত শরীরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙল সহদেবের ডাকে, ‘বাবু, আটটা বাজল উঠবেন নাই!’ প্রদীপ চোখ মেলে দেখল ঘরে সূর্যের আলো এসে পড়েছে, রাতের দুর্যোগের চিহ্নমাত্র নেই। আকাশও পরিস্কার। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গেল। রেডি হয়ে বেরোতে দেরী হল না। সহদেব একগাল হেসে চা বিস্কুট ধরল তার সামনে। ওর নির্মল হাসি কেন জানি মনে এক অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলল। সকালবেলা লক্ষ্মী তার সামনে আর আসে নি। আসবার সময় আরো একশ টাকা সহদেবের হাতে গুঁজে দিল সে। সহদেবের চোখ চকচক করে উঠল। গাড়ী স্টার্ট দেবার সময় সে বলল, ‘বাবু, আবার আসবেন।’ প্রদীপ কিছু না বলে বেরিয়ে এল। এরপর কতদিন ইচ্ছা হয়েছে লক্ষ্মীর কাছে যাবার, কিন্তু কি যেন একটা দ্বিধা, সংকোচ তাকে বার বার টেনে ধরেছে। আস্তে আস্তে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে সব।

*****

‘কিগো অন্ধকারে বসে আছ, আলো জ্বালাও নি কেন?’ সুমিতার কথায় সম্বিত ফিরল তার। সুমিতাই আলো জ্বেলে দিল। চা করল, চা নিয়ে প্রদীপের পাশে এসে ওকে চা দিয়ে বসল, বলল, ‘তুমি এত কি চিন্তা করছ দু’দিন ধরে, কোন পল্পের প্লট মাথায় এসেছে নাকি?’ ও জানে গল্পের প্লট মাথায় এলে প্রদীপ নাওয়া খাওয়া সব ভুলে যায়।

প্রদীপের মনে হল গল্পই তো – যদি নিছক একটা গল্প হয়, তবে তো ভালই। উত্তরে কিছু না বলে সে বলল, ‘কোথায় কি শপিং করলে দেখাও।’ এরপর তারা কেনা জিনিস দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রদীপ চিন্তামুক্ত হয়ে সুমিতার সঙ্গে কেনাকাটার আলোচনা করতে লাগল। পরের দিন সে সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে গাড়ী নিয়ে এল।

*****

এরপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। নিজের সংশয় মেটাতে একদিন প্রদীপ লক্ষ্মীর কাছে গিয়েছিল। এতদিন পর প্রথমটায় ওকে চিনতে না পারলেও পরে চিনেছে। চিনতে পেরে একটা গড় হয়ে প্রণাম করে বসতে বলেছে। তারপর বলেছে – বাবুকে সে তারপর অনেকদিন আশা করেছিল। বিশেষ করে সেদিন, যেদিন ও জানতে পেরেছিল ও মা হতে চলেছে। সত্যই বাবু তার কাঙ্ক্ষিত ধন দিতে পেরেছে।

সহদেব ভাল স্বামী হতে না পারলেও ভাল বাবা হতে পেরেছিল। বাসুদেব যেদিন জন্মায় সেদিন আহ্লাদে আটখানা হয়ে ব্যরাকশুদ্ধু সবাইকে ডেকে মিষ্টি খাইয়েছে। হাইওয়ে হবার সময় দোকানটা উঠে যায়। ডিউটি ছাড়া বেশীরভাগ সময় ছেলেকে নিয়েই কাটাত সহদেব। ছেলের প্রতি ভালবাসা ও চিন্তা দেখে লক্ষ্মীর ওর প্রতি সমস্ত রাগ ক্ষোভ অভিমান দূর হয়ে গিয়েছিল। সহদেবের ছেলে হয়েই ও বড় হতে লাগল। যখন পাঁচ বছর বয়েস, তখন আর্মির বড়সাহেবকে ধরে প্রাইমারী ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। সময় মত স্কুলে যাতায়াত করানো, বইপত্র কিনে দেওয়া, সবদিকেই নজর ছিল সহদেবের। ছেলে বড় হবার পর সহদেব মদ ছেড়ে দিয়েছিল। এ যেন এক নতুন মানুষকে দেখেছিল লক্ষ্মী। বাবুর কথা আর তার মনে পড়েনি। সব ভুলিয়ে দিয়েছিল সহদেব তার ব্যবহারে। বড় হবার পর বাসুদেবেরও বাবা অন্ত প্রাণ ছিল। যখন বাসুদেব স্কুল ফাইনাল পাশ করল, তখন লিভারের অসুখে সহদেব মারা যায়। আর্মির সাহেবদের ধরে সহদেবের চাকরীটা পেয়েছিল লক্ষ্মী। তারপর বাসুদেব নিজের চেষ্টাতেই সব করেছে।

এতদিন পর বাবু কে পেয়ে সবকথা উজাড় করে দিল সে; কিন্তু এও বুঝিয়ে দিল যে বাসুদেব তারই দেওয়া আশীর্বাদ হলেও ওদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রদীপের কোন স্থান নেই। সহদেবের ছেলে হয়েই ও বেঁচে থাকবে। বয়েসের সাথে সাথে লক্ষ্মীর কথাবার্তার বলিষ্ঠতা প্রদীপকে অবাক করেছিল। প্রদীপ ফিরে এসেছিল, কিন্তু ফিরে এসেছিল একটা চরম তৃপ্তি নিয়ে – এই তো তারই ছেলে – সেই ছেলেটা।

মোশাররফ খান

 

কাল ছিল অমাবস্যা, সন্ধ্যাভর গেল কালবৈশাখীর তাণ্ডব আর সারা রাত ধরে অঝোর বর্ষণ। প্রতিদিনের মত কাকভোরে বটমূলে পুজো দিতে এসে একেবারে দোলন বৌয়ের বিস্ফারিত চোখের সামনেই ঘটে গেল এই অদ্ভুত কাণ্ড। বিশাল বটের গুঁড়ি বেয়ে নেমে আসা জলের স্রোতের সাথে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে এক জোড়া ছটফটে তেলাপিয়া। চকচকে সোনালি আঁশে মোড়া ডিমভরা হলুদ পেট কাত হয়ে শুয়ে, থেকে থেকে লেজ নেড়ে খেলছে তারা একেবারে দোলন বৌয়ের পায়ের কাছে। বিস্ফারিত চোখে কম্পিত হৃদয়ে এক স্বর্গীয় অনুভবে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে দোলন বউ। তার মনে একটা তাৎক্ষণিক বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে উঠে – নিশ্চয়ই এই তেলাপিয়া ঈশ্বরপ্রেরিত এবং অলৌকিক কোন নিগূঢ় ইঙ্গিতের বাহন। সবার অলক্ষ্যে কোঁচড়ে জড়িয়ে পরম স্নেহে তাদের ঘরে নিয়ে যায় দোলন বৌ।

প্রতিদিনের ধরাবাঁধা শাকান্নের পাতে আজ সযত্নে সাজানো তেলাপিয়ার ব্যাঞ্জন দেখে অবাক হয় রমেন হালদার।
- কিরে দোলন, মাছ কোথা পেলি আজ?
- মাছ নয়, মাছ নয়, বল ঠাকুরের প্রসাদ! স্বয়ং ভগবান পাঠিয়েছেন গো!
সব শুনে রমেন তো হেসে কুটিকুটি।
- তুই যে কী বলিস দোলন, বটগাছে আবার তেলাপিয়া আসে কোথা থেকে?
- বিশ্বাস হয় না বুঝি? দেখবে তো কাল এসো ভোরে আমার সাথে বটমূলে।
সপ্তাহ না ঘুরতেই একদিন দোলন বউ রমেনকে আড়ালে ডেকে বলে,
- বলেছিলাম না এই তেলাপিয়া আমার ঠাকুরের আশীর্বাদ? এই দেখ এখানে, ওরা এসে গেছে। বলে রমেনের হাত টেনে নিয়ে তলপেটে ছোঁয়ায়।
- এখানে আছে, আমি জানি।
- বলিস কি দোলন! তবে যে ডাক্তার বদ্যিরা বলে তোর ছেলেপুলে হবে না কোনদিন!

অপলক চোখে রমেন চেয়ে থাকে দোলন বৌয়ের দিকে। রমেনের সহসা মনে হয় এ যেন অন্য কোন দোলন। রাতারাতি যেন তার শারীরিক ভূগোল বদলে গেছে। দোলনের শুভ্র স্নিগ্ধ শীর্ণ দেহটি ঘিরে রেখেছে অপূর্ব মাতৃত্বের ছায়া। এক অদ্ভুত শিহরণ নাড়া দিয়ে যায় তার সমস্ত অস্তিত্ত্ব। দোলন কি তাহলে সত্যিই মা হতে চলেছে?

সখী শোভনা সুন্দরী সেই কখন থেকে পিছু নিয়েছে। সকাল থেকে ঘুরঘুর করছে পায়ে পায়ে। কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করে চলেছে সমানে।
- লোকের মুখে কত কী শুনি। বটবৃক্ষ নাকি তোদের বর দিয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার উজাড় করে? আমায় বুঝি বলবিনে দোলন?
প্রিয় সখীর কন্ঠে অভিমান। তারপর দোলনের শরীরের দিকে চোখ পড়তেই চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে যায় শোভনার। হৈ হৈ করে উঠে সে।
- কিলো মাগী, পেট বানালি কবে? তুই না বাঁজা?
- চুপ চুপ, পোড়ারমুখী, চেঁচামেচি করিসনে, আয় বলি তোকে!
সইকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায় দোলন। বটমূলে তেলাপিয়ার আবির্ভাব থেকে পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া যাবতীয় ঘটনা আদ্যোপান্ত খুলে বলে সখী শোভনাকে।
- তুই আমার প্রাণের সই। কথাটা রাষ্ট্র করিসনে ভাই! দিব্যি রইল আমার।
- যাহ্‌, এসব কি রাষ্ট্র করার কথা?

- ঘরে আছিসনিকো দোলন মা! একদিন সকালে দাওয়ায় এসে হাঁক ছাড়ে অশীতিপর বৃদ্ধা রমলা দাসী। বুড়ির নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে, নইলে এই সাত সকালে এমন সোহাগী ডাক কেন? দাওয়ায় বেরিয়ে আসে দোলন বৌ।
- রমু মাসি যে! কি মনে করে, এদিকে যে বড় আস না আজকাল?
- কোতাও কি যাতি পারি রে? বাতের ব্যথায় শরীল জরজর। হাটতি চলতি পারিনে। তোর কাচে কি মলম আচে দোলন? একটু মালিশ করে দিবি মা?

তো এই হলো আসল কথা। রমু মাসির জন্য দোলন বৌয়ের মনটা অসীম মমতায় ভরে উঠে। রমলা দাসীকে একটি জলচৌকিতে বসিয়ে তার হাড্ডিসার বুকে পিঠে আর্শ্চয মলমের মালিশ লাগায় বড় যত্নের সাথে। আরামে চোখ বুজে আসে বুড়ির। দোলনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে -
- সেদিন শোভনা যে কইলে তোর কাচে দেবতার বর টর কি এয়েচে। আমার বাতের ব্যাথাটা সেইরে দে না মা!
- সামনের মঙ্গলবার বৈশাখী অমাবস্যা। ভোরের বেলা বট মূলে এসো একা। দাওয়াই দেবনে। দোলনের মুখ দিয়ে ফস্‌ করে বেরিয়ে যায় কথাগুলো কোন চিন্তাভাবনা না করেই। রমলা দাসীর ফোকলা দাঁতের ফাঁকে চিকচিক করে প্রত্যাশার হাসি।

রমেনদের পৈত্রিক সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। শুধু আড়াই বিঘে জমি জুড়ে এই বিশাল বটের ঘন অরণ্য। আশে পাশে দু’এক চিলতে চাষের জমি, তার সাথে লাগোয়া এই এতটুকু বসত বাটি। রমেন আর দোলনের ছোট্ট সংসারে অভাবের টানাপোড়েন লেগেই আছে বছর ভর। বিত্তবানদের নজর পড়ে আছে এই জমিটুকুর উপর। প্ররোচনা, লোভ-লালসার হাতছানি, ভয়ভীতির আস্ফালন সবই আছে। তবুও শত অভাব-অনটনেও এই আড়াই বিঘের উপর কখনো হাত দেয়নি রমেন হালদার।

স্বর্গীয় পিতৃদেব বলে গেছেন – এ আমাদের সাত পুরুষের আদর-সোহাগে পালিত বট। এই প্রাচীন বটের বিশাল দেহের চড়াই-উৎরাইয়ে, বৃক্ষকাণ্ডের খানা-খন্দে, ঘন ডালপালার আলো-আঁধারিতে কতশত পাখপাখালি, সাপখোপ, কীটপতঙ্গ গড়ে রেখেছে শত বছরের নিবাস। এই বট ওদের জন্মভূমি। বিচরণের অভয়ারণ্য। নিঃঝুম রাতের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে এই বট রচনা করে তার নিজস্ব জীবজগতের নৈশ মেলার আসর। নিশাচর পাখি, জোনাকি, ঝিঁঝিঁ আর তাবৎ বাচাল কীটপতঙ্গদের নৈশ সঙ্গীতে মাতোয়ারা হয় এই বটের অরণ্য আর তার আশপাশ। দেশান্তরী পাখপাখালি কত দূরের মুলুক থেকে উড়ে আসে। বটের মগডালের চাতালে ঘন ডালপালা আর পত্রভূমির উপত্যকায় গড়ে তোলে শীতের নিবাস। এখানে জন্মায় বংশধর। এখানের ডালে ডালে লাফায় পক্ষীশিশু। ক্রমে তারা বড় হয়, শিক্ষিত হয়ে উঠে জীবনধারণের নানাবিধ কলাকৌশলে। তারপর গ্রীষ্মের প্রাক্কালে দল বেঁধে উড়ে যায় অন্য গন্তব্যে। শত অনটনেও যেন এই বটের গায়ে হাত দিসনি বাপ! কেড়ে নিসনে কখনও ওদের এই প্রাচীন নিবাস!

কেমন করে যেন আবার ঘুরতে শুরু করে রমেনদের মরচে ধরা ভাগ্যের চাকা। দোলন বৌয়ের কোল জুড়ে বসে শুভ্র স্নিগ্ধ যমজ শিশুর মেলা। হাটে রমেনের লুঙ্গি-গামছার কারবারের পালে লাগে মা লক্ষ্মীর দাক্ষিণ্যের হাওয়া। দু’দুটো দুধেল গাভীর দুধে সকাল-বিকেল যেন বান ডাকে! বাড়ীর পাশের দুফালি জমিতে এবার দিয়েছিল মাঘী সরষে। সেখানেও মরসুমে বয়ে যায় সবুজ হলুদের বান।

হালদার বাড়ীর ভাগ্যের পালা বদলের শুভাকাঙ্খী যেমন অনেক, তেমনি নিন্দুকেরও অভাব হল না মোটেও। এবাড়ী ওবাড়ী কানাঘুষো। হালদার বংশের নিভে আসা প্রদীপ রমেন হালদারের কপাল ফিরেছে, এও কি সয়! হিংসায় জ্বলে মরছে জ্ঞাতি’শত্রু ভোলা বাঁড়ুজ্যে। দেবতার বরটরের গল্প নাকি হালদারদের মিথ্যাচার, ভাঁওতাবাজি। একদিন সে রাজ্যের মানুষ জড়ো করে বুক চিতিয়ে বলেই বসল, দেখাচ্ছি আজ হালদারদের জারিজুরি। টারজান স্টাইলে লাফিয়ে লাফিয়ে এ-ঝুরি ও-ঝুরি হয়ে তরতর করে উঠে গেল সে বটের উঁচু ডালে। তেলাপিয়া রহস্য অভিযানে দ্রুত অদৃশ্য হল ঘন বটপত্রের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে। অনেকখানি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভোলার নেমে আসার নাম নেই। নৈশঃব্দে স্থির হয়ে আছে বটের মূলে অপেক্ষমান জনতার ভিড়। কী করছে ভোলা এতক্ষণ দুর্গম বটের গহীন গভীরে! এক ঝাঁক হাড়গিলে ব্যস্ত হয়ে ডানা মেলে উঠে পড়ল বটের শীর্ষ ছেড়ে। ত্রস্তে পাখা ঝাপটে উড়ে গেল তারা, খাল পেরিয়ে, তমাল বনের পাশ কাটিয়ে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় শিউরে ওঠে মানুষ। ঠিক তখনই, ধপাস করে বটের মূলে আছড়ে পড়ল ভোলার শরীর। মুখে ফেনা তুলে, হাতেপায়ে খিঁচুনি দিয়ে, ছটফট করতে করতে সবার চোখের সামনে ভোলার বিশাল দেহটি স্থির হয়ে গেল। এক প্রবীন এগিয়ে এসে পরখ করে বললেন – কালনাগিনীর কোপ। এমন ঔদ্ধত্য কী দেবতার সয়? তেনাদের সাথে দাদাগিরি? বলে তিনি চোখ মুদে জোড়া হাত উপরে তুলে অদৃশ্য দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন। ভোলার মরদেহের সৎকার শেষে দল বেঁধে শ্মশানযাত্রীরা ফিরে এল হালদারদের বটমূলে। জল দিয়ে ফুল দিয়ে পুজো দিল প্রস্থে প্রস্থে। পূজারীরা বাড়ী বয়ে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে গেল দোলন বৌকে। ভক্তিতে বুঁদ হয়ে বসে রইল তারা দোলন বৌয়ের পায়ের কাছটিতে। রোগ-শোক-বিপদ থেকে সুরক্ষা দাও মা-জননী।

প্রতিষ্ঠিত হলো হালদারদের বটবৃক্ষের তেলাপিয়ার মিথ।

******

কালে কালে পুরোনো বটের প্রশস্ত কাণ্ডের ভিতরে ক্ষয়ে যাওয়া বিশাল গর্তে বৃষ্টির জলে সৃষ্টি হয়েছে গভীর জলাধার। সেখানেই সে দেখে এসেছে তাদের। ঐ বিশাল বটের গোপন গুহায় সত্যিই গড়ে উঠেছে এক তেলাপিয়া উপনিবেশ। ঝাঁকে ঝাঁকে, ক্ষুদ্র পোনা থেকে মাঝারি, বৃহৎ এবং প্রবীণ, গুচ্ছের তেলাপিয়া। রহস্য শুধু এটুকুই, ওখানে ঐ অত উঁচুতে গহীন বটের গহ্বরে তেলাপিয়ার আবির্ভাব হল কেমন করে? রমেন হালদার ভেবে বের করেছে, ভূমিতল থেকে বটবৃক্ষের ঐ উচ্চতায় তেলাপিয়া মাইগ্রেশনের এক সম্ভাব্য পটভূমি। হয়তো একদা কোনো তৃষ্ণার্ত কাক কিংবা বক পাখি আশেপাশের ডোবা-নালায় জল পান করে উড়ে গিয়ে বসেছিল ঐ বটের ডালে, কোনো ভাবে বয়ে এনেছিল কিছু পরিপক্ক তেলাপিয়ার ডিম। তা থেকেই উৎপত্তি আর কালে কালে বংশবিস্তার। বর্ষার মৌসুমে ঝড়বৃষ্টির তোড়ে বটবৃক্ষস্থ জলাশয়ে যখন বয় জলোচ্ছ্বাস, তখনই বুঝি বিপথগামী হয় কিছু বানভাসী তেলাপিয়া। তাদেরই দু’একটা নেমে আসে গুঁড়ি বেয়ে একেবারে বটের গোড়া পর্যন্ত। বাস্তবতার নিরিখে এটাই হতে পারে বটবৃক্ষে তেলাপিয়ার সম্ভাব্য পটভূমি।

কিন্তু দোলন বৌকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্যি? তার কাছে তো এই তেলাপিয়া প্রগাঢ় রহস্যে ঘেরা। স্বর্গবাসী দেবতার বর বিশেষ। এই তেলাপিয়াকে ঘিরে তার মনে বাসা বেঁধেছে এক গভীর প্রত্যাশা আর নিবিড় বিশ্বাসবোধ। তার বিশ্বাস ভগবান না জানি তাকে কোন পুণ্যের বর দিয়েছে। এই নতুন ভাবনা দোলন বৌকে উদ্বেলিত করে রাখে অহর্নিশি। স্বর্গপ্রেরিত এই তেলাপিয়ায় কি আছে ধরাতলের তাবৎ দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম? প্রসবোন্মুখ নারীর দুর্বহ প্রসববেদনার অলৌকিক নিরাময়? মানবজাতির কোন দুর্বিনীত সমস্যার স্বর্গীয় সমাধান?

সেই থেকে বড় রহস্যঘেরা হয়ে রইল এই বটবৃক্ষ আর তার গর্ভোৎসারিত ঐশ্বরিক তেলাপিয়া! সেই থেকে ফি-বছর বৈশাখী অমাবস্যার ভোরে হালদারদের বটমূলে নামে হাজার মানুষের ঢল। উৎসবমুখর হয়ে উঠে শ্রীধরপুর গ্রাম। বট অরণ্যের চারপাশ ঘিরে রাতারাতি গড়ে ওঠে শতেক দোকানপাট। বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, মন্ডা-মিঠাইয়ে মেলা জমজমাট থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। অসুস্থরা আসে দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম কামনায়। নিঃসন্তান রমণীরা গোপনে ব্যক্ত করে সন্তানবতী হওয়ার আকুল বাসনা। এমনি আরও কত মানুষ মনের গভীরে লুক্কায়িত কামনায় বটমূলে উপবিষ্ট ধ্যানগম্ভীর দোলন বৌয়ের হাতের এক লোকমা তেলাপিয়া-অন্ন মুখে পুরে ফিরে যায় পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশা বুকে নিয়ে। কেউ কিছু ফল পায়, কেউ পায় না। যাদের হয়, তারা সেই অলৌকিক নিরাময়ের কথা ছড়িয়ে দেয় দূর থেকে দূরান্তরে। যাদের হয় না, তাদের খবর কে-ই বা রাখে।

দিন মাস বছর ঘুরে ফিরে আসে। দোলন বৌয়ের বিশ্বাস আরও ঘনীভূত হয়, তার হাতে দেবতারা গচ্ছিত রেখেছেন মানুষের মঙ্গল। অঝোর বর্ষণের রাতে স্বর্গরাজ্যের কোন অজানা বহতা নদীর তীর্থ ছেড়ে ঘন বটের বন পেরিয়ে ভূতলে নেমে আসে যে আত্মত্যাগী তেলাপিয়া, তারাই সেই মঙ্গলের বাহন। দোলন বৌয়ের গভীর প্রত্যয় দিনমান তার স্নিগ্ধ শুভ্র অবয়বে মাখিয়ে রাখে স্বর্গীয় আবীরের ছটা। রমেন সারাদিন ভাবে। ভেবে ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কি ভাবে কী হয়, রমেন সেসব বোঝে না। হয়তো মানুষের মনস্তত্ত্ব, বিশ্বাস আর আস্থার সাথে নিবিড় কোন যোগাযোগ আছে তার শারীরিক রসায়নের। রোগ-ব্যাধি, সুখ-দুঃখ, হতাশা, বিষাদ, তৃপ্তি, অবসাদ, সবই বুঝি সেই শারীরিক রসায়ন-নিয়ন্ত্রিত অবস্থা বিশেষ। বটবৃক্ষের তেলাপিয়ার উৎস-রহস্য তো রমেন হালদারের অজানা নয়। তবু যেন দোলন বৌয়ের প্রগাঢ় বিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দিতে মন চায় না তার। নিশিদিন ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে সে। দোলনের অলৌকিক তেলাপিয়াদের অমঙ্গল চিন্তায় তার মনপ্রাণ অস্থির হয়ে থাকে। তার ভয়, যদি কোনোদিন শুকিয়ে যায় এই বটের গুপ্ত জলাধার! যদি কোনো নির্দয় খরা এসে শুষে নেয় বট গর্ভের সঞ্চিত সবটুকু জল। যদি তেলাপিয়ারা এককালীন নির্ব্বংশ হয়ে যায় কোনো বিষধর সর্পের দংশনে! কোনোদিন বৃষ্টিস্নাত ভিজে বটের গুঁড়ি বেয়ে ছটফটে রূপালী তেলাপিয়ারা যদি আর ফিরে না আসে!

About this blog

hit counter

Sample text

ফেসবুকে আমাকে ফলো করুন

ভিজিটর কাউন্ট

Resources

মোট পোস্ট হল

জনপ্রিয় পোস্ট গুলি

আজকের তারিখ হচ্ছে

Powered by Blogger.

Ads 468x60px

Social Icons

সমস্ত পোস্ট গুলি এখানে

Featured Posts