Showing posts with label বাংলা গল্প. Show all posts
Showing posts with label বাংলা গল্প. Show all posts

তাপস কিরণ রায়

 

রাত অন্ধকার হয়। অনেক আলোর বন্যায় আমরাই তাকে স্বচ্ছতায় তুলে ধরি। আর চাঁদ, দ্য ল্যাম্প অফ দ্য নাইট, রাতের প্রকৃতিকে দেখতে আকাশে ঝোলানো থাকে! এই চাঁদের আলো, মানে, জ্যোৎস্নায়, বড় মায়া জড়িয়ে থাকে। মনে পড়লেই রোদ যেমন চিটচিটে গরম আর অস্বস্তির মানসিক উত্তেজনা নিয়ে আসতে পারে, তেমনি শান্ত নিশ্চিন্ততার ভাবনা জ্যোৎস্নার মধ্যে খুঁজে পাই।

এমনি এক আলোআঁধারি জ্যোৎস্নায় শহীদ মিনারের পাশে গার্ডেনে বসে আছে রজত। গরমের দিন, রাতের দিকে গরম কমে যায়। না ঠাণ্ডা, না গরমের মাঝখানে, আরও যদি জ্যোৎস্না রাত হয়, ভালো লাগবেই। আর ঘিঞ্জি কলকাতার রাস্তাঘাট ছেড়ে ছোটবড় কোনো বাগানে কিছু সময়ের জন্য বসলে সত্যি ভালো না লেগে পারে না। খোলা হাওয়া যেটুকু পাওয়া যায়, তাতেই মনে হয় শরীর জুড়িয়ে গেল।

রজতের ভালো লাগছিল, ও একাই এসেছিল ধর্মতলায়, ইলেকট্রনিক্স আইটেমের নাকি ভালো দোকান আছে এখানে। বেহালা, যেখানে উঠেছে রজত, সেই পর্ণশ্রীর ধারেকাছে কোথাও বড় ইলেকট্রনিক্সের দোকান নেই। আর সেই যদি কোথাও বের হতে হয়, তবে ধর্মতলা গেলে ক্ষতি কি? ঘোরায় ঘোরা হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে বেশ ক’টা দোকান ঘুরে পছন্দ মত মোবাইল কিনতে পারবে। এমনই ভেবে ধর্মতলা আসা। মোবাইলের মধ্যে এল-জি’র সেট পছন্দ করল রজত। দাম সাড়ে চার হাজার টাকা, সস্তা, সুন্দর, মজবুত। পুরোনো যে মোবাইল, যেটা তার কাজে লাগছিল, সেটা অনেক দিনের পুরোনো। ওপরটা ঘষেটষে ঔজ্বল্য হারিয়েছে। আর মডেল বড় পুরোনো ছিল, সব দিক ভেবে নতুন নেওয়া।

সন্ধ্যের মধ্যে মোবাইল তো নেওয়া হয়ে গেল, এবার কি করা যায় ভাবছিল রজত। শহীদমিনারের পাশের গার্ডেনের কথা মনে হলো তার। এদিক-ওদিক না ঘুরে নিশ্চিন্তে ক’টা মিনিট বসা যাক ভেবে গার্ডেনে এসে বসল। আশপাশে তাকিয়ে দেখল আরও বেশ কিছু লোকজন বসে আছে। দু’তিন জায়গায় যত দূর নজর যায় জোড়ে জোড়ে বসে থাকতেও দেখা গেল। গার্ডেন মানেই তো তাই, জোড়ে এসে বসে থাকার প্রশস্ত জায়গা, সামান্য আনন্দ-স্ফূর্তি, খুনসুটি, বসন্ত বয়সে সবাই এটা চায়।

খালি জায়গা নিয়েই বসে আছে রজত। পাঁচ মিনিট বসে থাকার পর উঠবে উঠবে ভাবছিল, এমনি সময় একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো তার সামনে, একটু দূরত্ব নিয়ে। রজত অবাক হল।

কি ব্যাপার? মেয়েটার হাবভাবে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চায়। মেয়েটি মৃদু স্বরে কি যেন বলল, রজতের বোধগম্য হল না। আবার মেয়েটি ঈষৎ চাপা স্বরে বলে উঠল, সঙ্গিনী চাই?

–মানে বুঝলাম না, রজত বলে ওঠে। মনে মনে সে ভয় পায়, খারাপ মেয়েছেলে নয় তো! পটিয়ে-পাটিয়ে পয়সাকড়ি নিয়ে ভেগে পড়তে পারে।
–ভালোবাসার লোক চাই? ঈষৎ হাসি মেয়েটির মুখে, যদিও মলিনতা ঘিরে আছে তার সমস্ত শরীর।
ভয় পেয়ে যায় রজত, নিশ্চয়ই মেয়েটি দেহপসারিণী হবে। এ ধরণের ঘটনার সামনাসামনি কখনো হয়নি সে, বলে ওঠে, না, না, আমি এখন ঘরে যাব।
মেয়েটি মিষ্টি ভাবে বলে ওঠে, ঘরে তো কেউ না কেউ থাকবেই, গার্ডেনে তো আপনি একা!
–না, না, আমার কাউকে চাই না, এখনই আমি ঘরে যাব, উৎকণ্ঠায় বলে ওঠে রজত।
মেয়েটি বলে ওঠে, এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি বাঘ-ভাল্লুক নই, মানুষ, না হয় দু’টি কথা আপনার সঙ্গে প্রেমিকা হয়ে বললাম! বেশী লাগবে না, আধ ঘন্টায় বিশ টাকা দেবেন।

উঠে যেতে থাকে রজত, ভাবে, মেয়েটি বলে কি! প্রেমিকার অভিনয় করবে বিশ টাকায়! তারপর জমে গেলে আরও কত কিছুর রেট বলে বসবে। এমনি করে ফাঁসিয়ে সর্বস্বান্ত করবে।

মেয়েটি আরও একটু কাছে এল, ফিসফিস করে বলে উঠলো, জানেন, আজ সারা দিন একটি পয়সাও পাইনি, সকাল থেকে পেটে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি ছাড়া কিছুই পড়েনি, ঘরের মা আর ভাইকে কি খাওয়াব বলুন!

রজত দাঁড়ায়। মনে হয় এমনি ভাবে ওরা কথার ফাঁদ পাতে, মিষ্টি মিষ্টি সুন্দর সুন্দর কথা বলে, তারপর নিয়মিত খদ্দের বানায় – আর লোকেদের চরিত্র হনন করে, টাকা পয়সা আত্মসাৎ করে পথে বসায়। রজত কি মনে করে পকেট থেকে পাঁচ টাকা বের করে, মেয়েটার হাতে দিয়ে বলে, এটা রাখো।

মেয়েটি টাকা নেয় না, বলে, না এমনি এমনি আমি টাকা নিই না, আমায় বিশ্বাস করুন আমি কোনো ছলনা করছি না, এমন কি আমি আপনাকে দেহ দান করতেও আসি নি, শুধু দু’টি মিষ্টি কথার অভিনয় করে ক’টা পয়সা চাই আমি।

কি উত্তর দেবে রজত বুঝতে পারল না। বেশভূষায় মেয়েটিকে অতি সাধারণ মনে হচ্ছে। বয়স বিশ-পঁচিশের ভিতর, উগ্র সাজসজ্জা শরীরে নেই, গা থেকে পারফিউমের কোনো গন্ধ আসছে না। পরিচ্ছদে উগ্র চাকচিক্য নেই। তবে কি মেয়েটি যা বলছে তা সত্যি! কিন্তু এমনি ভাবে কি কেউ পয়সা রোজগার করতে পারে? লোকেরা এমনি ভাবে তাকে পয়সা রোজকার করতে দেবে? দু’দিন পরেই তো সে বাধ্য হবে দেহ দান করতে… তখন… যাক এতসব ভাববার তার কি দায় পড়েছে!

মেয়েটি রজতের দিকে তাকিয়ে করুণ ভাবে হাসল, বিশ্বাস করতে পারছেন না আমায়! আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি চাই না।
–না, না, আমায় যেতে হবে, আর্জেন্ট কাজ আছে।
–ঠিক আছে যান, আপনার নামটা বলবেন?
–কেন, নাম দিয়ে কি হবে?
–ধরুন অজয় আপনার নাম, আমার আপনাকে বলতে হবে, অজয়দা, কত দিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা, চলো না দু’মিনিট কোথাও বসি, আমায় কি তোমার ভালো লাগে না!
–মেয়েটি তার রোজের অভিনয়ের কিছু অংশ বলে চলে। সত্যি কি অদ্ভুত! জীবনে খুব কমই এমন চমকদার ঘটনা ঘটে।

কিন্তু রজতের হঠাৎ চমক ভাঙল তখন যখন দেখল গার্ডেনের আবছায়ায় কোনো ঝোপঝাড় থেকে দুটো মেয়ে বেরিয়ে এসে এই মেয়েটির চুল টেনে ধরল। একি! কি হচ্ছে রজতের চোখের সামনে? পরে আসা মেয়েদু’টির মধ্যে একজন বলে উঠল, হারামজাদী, বেরো এখান থেকে! আবার এসেছিস তুই! দলের অন্য মেয়েটা আরও কদর্য কিছু গালি দিয়ে, একজন চুল টেনে, আর একজন ধাক্কাতে ধাক্কাতে রজতের অভিনেত্রী প্রেমিকা মেয়েটিকে গার্ডেন থেকে বের করে দিতে তৎপর হয়ে উঠল। যেতে যেতে প্রেমিকা মেয়েটি মিনতি ভরা চোখ নিয়ে দু’তিনবার তাকাল রজতের দিকে।

সত্যি খুব খারাপ লাগছে রজতের। বেচারা, সত্যি হয়তো সারা দিন ঝালমুড়ি ছাড়া আর কিছুই তার পেটে পড়েনি। একবার মনে হল, কেন ওর হাতে পনের-বিশ টাকা গুঁজে দেয়নি!

এমনি সময় ফিরে এলো জাঁদরেল মেয়ে দুটি, রজতকে বলে উঠল, ওর পাল্লায় পড়বেন না যেন, আপনাকে দু’দিনে ছিবড়ে বানিয়ে দেবে! তারপর ওদের মুখ থেকে উত্তেজনার ভাবটা সরে গেল, শান্ত হয়ে এক জন অন্য জনকে দেখিয়ে হেসে বলল, এর সঙ্গে চলে যান ওই গাছটার আড়ালে, ওর নাম চন্দ্রা, ওর সঙ্গে ভালবাসা করুন গিয়ে।
–না, না, আমি যাচ্ছি, রজত বলে ওঠে।
–কোথায় যাবেন, সবে তো সন্ধ্যে, রজতের হাত আলতো ভাবে সুন্দর ভঙ্গিমায় তুলে ধরে চন্দ্রা। প্রেমিকার মত হাসে সে, শরীরে উগ্র পারফিউমের গন্ধ তার। গন্ধে আশপাশের জায়গাটা পর্যন্ত উৎকট হয়ে উঠেছে। হেসে চলেছে মেয়েটা রজতের মুখের দিকে চেয়ে।
–কি হল, চলুন না, মজা পাবেন, বলে নাচের ভঙ্গি করে আবার হেসে ওঠে মেয়েটা।

কি করবে এবার রজত, সাথে রাখা মোবাইল, টাকাপয়সা সবই যদি ও নিয়ে যায়! শুনেছে রজত, কথা না শুনলে ওরা নাকি আরও দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। মায়, জামা-প্যান্ট খুলে ল্যাংটো করে ছেড়ে দেয়!
ভয় আরও জাঁকিয়ে বসল রজতের মনে, আর এই জন্যই বোধহয় সে এ যাত্রা বেঁচে গিয়েছিল।

রজত বলে, আমার আর্জেন্ট কাজ আছে, আমি যাব।
–কোথায় যাবে তুমি! রজতের গায়ে হেলান দিয়ে আরও নিবিড় হয় চন্দ্রা।
–সরুন আমি বাড়ি যাব।
–বাড়ির ছেলে বাড়ি তো যাবেই গো, তার আগে চলো না আমরা খেলা করি দু’জনে!
হেসে টানতে থাকে রজতকে। চন্দ্রা বুঝতে পারে এ ছোকরা একেবারে আনকোরা।

আশপাশের হেঁটে যাওয়া আসা লোকেরা কেউ কেউ ওদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেউ কেউ হাসছিল। রজতের কাছে ভীষণ লজ্জাকর ছিলো ব্যাপারটা।
প্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে চন্দ্রা রজতকে। পাশে ঝোপের মত জায়গা, মনে হয় কাগজী ফুল গাছের ঝোপ। শুনেছে ওই গাছে কাঁটা থাকে।

দু’কাঁধে হাত রেখে প্রেমিকার মত সুন্দর করে বসিয়ে দিল রজতকে। আর কিছু না বলে সোজা রজতের দু’গালে চুমু খেয়ে দিল। রজত কি বাইরে থেকে শান্ত হয়ে যাচ্ছে? ভিতরে গুপ্ত স্থানে কি তার ধীরে ধীরে সাড়া জেগে উঠছে? না, তেমন হয় নি, ভয়ে সে এখনো স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে নি। ওর মনে একটাই চিন্তা, কি করে ওর হাত থেকে রেহাই পাবে!

–দেখ, সময় নেব না, পাঁচ মিনিটে তোমায় শান্ত করে দেব! বলে চন্দ্রা নিজের কোমরে হাত দিল, সামনের দিক থেকে ব্লাউজের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজল। না, নেই, নিজের মনেই বলে উঠলো চন্দ্রা, নিশ্চয়ই পড়ে গেছে কোথাও। তার পর কিছু একটা মনে করে চিৎকার করে উঠল, ওই মাগী মেয়েটাকে তাড়াতে গিয়ে শিশিটা পড়ে গেছে কোথাও, হারামজাদী আমার পাঁচ টাকার তেল ফেলে দিল! মুহূর্ত চুপ থেকে রজতের মুখটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে চুমু কাটল চন্দ্রা, বুকে-পিঠে হাত রেখে হাতটা ধীরে ধীরে নিম্নাঙ্গের দিকে নিয়ে গিয়ে দু’বার হাত বুলোলো, আর ছোট্ট ছেলেকে বোঝাবার মত করে বলল, আসল কিছু তো এখানে করতে পারবে না, তাই সুন্দর করে একবার আউট করে দেব, কেমন? একটু থেমে আবার বলে উঠল, তবে লক্ষীটি, একটু বসো তুমি, এখনই আসছি। চন্দ্রা ঝট করে তেলের যোগাড়ে চলে গেল।

মাথা চন করে উঠল রজতের, বুদ্ধি খেলে গেল হঠাৎ, কেউ যেন তাকে বলে দিল, পালা, পালা শিগ্‌গীর… ও চারিদিক তাকিয়ে দেখে নিল, চারিদিকে গাড়িঘোড়ার শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না, তবে হ্যাঁ, একদিক থেকে বেশ উজ্জল আলোর আভা আসছিল, সে দিকে তাকাল, অদূরে রাস্তার সামান্য অংশ দেখা যাচ্ছিল, সারি সারি লাইনে গাড়ি যাতায়াত করছে, আর সময় নেই, ঝোপঝাড়ের ফোকর গলিয়ে ছুটল সে। প্রায় শ’পা ছুটেই পেয়ে গেলো গার্ডেনের সীমানার দেওয়াল, এক কোমর উঁচু ছিলো সেটা, টপকাতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না রজতের। লাফ দিয়ে টপকে সে জনতা আর গাড়ির ভীড়ে মিশে গেল।

সেখান থেকে তেরো নম্বর বাস ধরে সিধা কাকার বাড়ি – পর্ণশ্রীতে পৌঁছে গেল। রজত কাকার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে, এমনি সামার ভেকেশনের সময় প্রতিবারই প্রায় কাকার বাড়ি ঘুরে যায়। কাকু-কাকিমা দু’জনেই তাকে ভালবাসেন, সব সময় তাঁদের কাছে ঘুরে যেতে বলেন। সেইমত এবার রজত এসেছে কাকার বাড়ি, আরও তিন দিন তার থাকার কথা।

গার্ডেনের ব্যাপার তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। বন্ধুদের কাছে শুনেছে এধরণের ঘটনা বড় বড় শহর-নগরে ঘটে। তবে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করার চমক যেন ছিল অন্য রকম! জীবনকে কত অভিজ্ঞতা নিয়েই না এগিয়ে যেতে হয়।

ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে যে তাকে ওর প্রেমিক হতে বলেছিল। ও হতে চেয়েছিল তার প্রেমিকা, বিনিময়ে বিশ টাকা সে নেবে। দিন-দিন রোজগারের পন্থা কত বিচিত্র ধরণের হয়ে যাচ্ছে।

মেয়েটি গরীব ছিল সন্দেহ নেই, সংসারে সেই হয়তো একমাত্র রোজগেরে, সত্যি হয়তো তিন-তিনটি পেট ওর রোজগারেই চলে। ও খুব নিরীহ ধরনের ছিল, তবেই তো ওকে মার খেতে হল। আহা, বেচারা বলছিল, দিনভর কিছুই খায়নি! রজতের মন কেমন করে উঠলো।

মেয়েটির চেহারা ছিল ছিমছাম, আবছা আলো-অন্ধকারে তেমন বোঝা যাচ্ছিল না কতটা সুন্দরী দেখতে ছিল। তবে রজত দেখেছে ও মার্জিত ছিল। কথাবার্তায় তো খুব মিষ্টি ছিল তাতে সন্দেহ নেই।

রজত এখন যদি তার দেখা পায় চিনতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, তার গলার মার্জিত সুর এখনো তার মনে গেঁথে আছে। সে যদি তার সামনে এসে কোনো কথা বলে, তার কন্ঠ নিশ্চয় রজত চিনে যাবে।

মন্দ হত না যদি আবার তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। আর চন্দ্রা, সে কেমন! নিজের মনকে প্রশ্ন করে রজত, ওরে বাবা, সে তো সাংঘাতিক, পারলে গায়ের সব রস সে নিংড়ে নিতে পারে। ভাগ্যক্রমে ওর হাত থেকে বিনা তেলে ফসকে আসতে পেরেছে সে!

রজত ভাবলো, যাবে নাকি আরেকবার ধর্মতলা, শহীদ মিনার, সেই বাগানে, যেখনে রঙচরীরা খেলা করে! এমনই মনের কোণায় লুকোনো ইচ্ছা থেকেই একদিন আবার রজত চলে গেল শহীদ মিনার লাগোয়া সেই বাগানের কাছে। আর, আর কোনো মূল্যবান জিনিস তার সাথে রাখল না, গোনাগুন্তি সামান্য টাকা সঙ্গে রেখে নিল।

শহীদ মিনারের আশপাশে ঘুরতে লাগলো রজত। গার্ডেনের এদিক ওদিক বাইরে লক্ষ্য করতে লাগলো। তখন স্পষ্ট দিবালোক ছিলো, ওই দিনের মত সন্ধ্যের কাছাকাছি সময় নয়, জোড়ে জোড়ে ছেলে মেয়েরা বাগানে ঢুকছে, বের হচ্ছে। এর মধ্যে কি আছে সেই মেয়েটি যে তাকে বলেছিল অজয়দার অভিনয় করতে!

রজত লক্ষ্য করে দেখল, গার্ডেনের এক কোণায়, বাইরের দিকে দেওয়ালে হেলান দিয়ে এক মহিলা এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। কে জানে, ওদিনের মেয়েটি হবে কি না? রজত তাকালো মহিলার দিকে, না, সে চোখ সরিয়ে নিল, রজতের দিকে চাইবার উৎসাহ দেখাল না। তার মানে, এ মহিলা সেই মেয়ে হতে পারে না। আর এক জায়গায় রজত খেয়াল করল, বাগানের বাইরে, গেটের একদিক থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, মনে হল গার্ডেনের ভেতরে যেতে তার ইচ্ছা নেই। চেহারা-আকৃতিতে মনে হলো সে হলেও হতে পারে। রজত আরও কাছে গেল তার, মেয়েটির থেকে হাত-দশেকের মত দূরত্ব নিয়ে দাঁড়াল। বাইরের দিকে মেয়েটি কম তাকাচ্ছে। গার্ডেনের ভিতরের দিকে যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথচ ভেতরে ঢুকছে না। তবে কি ভেতরে ঢুকতে সে ভয় পাচ্ছে! রজত ভেবে নিল, এই সে হতে পারে, চন্দ্রা আর তার সাথের গণিকা মেয়েটিকে তার ভয়, আবার যদি তারা গলাধাক্কা দিয়ে, চুলের মুঠি ধরে বাগান থেকে তাকে বের করে দেয়! এমনি সময় মেয়েটি রজতকে লক্ষ্য করল, তারপর দু’তিনবার তাকাল, তৃতীয়বার চোখাচোখি হতে রজত সাহসে ভর করে এক পা দু’পা করে ওর দিকে এগোতে থাকল। অনেক কাছে এগিয়ে গেল রজত, মেয়েটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

মেয়েটি মৃদু হাসল রজতের দিকে তাকিয়ে, তারপর বলল, কাকে খুঁজছেন আপনি?
কি বলবে রজত একটু সময় চুপ থেকে ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ, মানে – আপনিও কি কাউকে খুঁজছেন?
মিষ্টি হেসে ও বলল, হ্যাঁ, কোনো বন্ধুকে।
রজতের এবার খেয়াল হলো, হ্যাঁ, এ কণ্ঠ তার পরিচিত মনে হচ্ছে! ও সাহস ভরে বলে উঠল, আচ্ছা আপনার সঙ্গে কি আমার গত পরশুদিন আলাপ হয়েছিল?
–আপনার সঙ্গে! বলে ও কিছু সময় চিন্তা করল।
–হ্যাঁ, আমার নাম অজয়, অজয়দা, নামটা আপনি দিয়ে ছিলেন, রজতের বদ্ধ ধারণা এ সে না হয়ে পারে না – মেয়েটি তার রোজকার নাটকের মাঝখান থেকে অজয়দার নাটকের সংলাপ স্মরণ করে উঠতে পারছে না, আরও পরিষ্কার ভাবে মনে করিয়ে দেবার জন্য বলে উঠে রজত, আপনাকেই তো দু’টো মেয়ে গার্ডেন থেকে বার করে দিয়েছিল!
এবার মাথা নাড়ল মেয়েটি, আচ্ছা আপনি ছিলেন সে দিন! সেই বোকা বোকা কম কথা বলা ছেলেটা! মেয়েটি এবার প্রাঞ্জল হাসল, রজতের আরও একটু কাছে এসে দাঁড়াল।

নিজেকে সংযত করতে পারলনা রজত, বলে ফেলল, চলুন না, গার্ডেনে ঘুরে আসি একটু সময়।
মেয়েটির মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল, না, গার্ডেনে না, চলুন আমরা গার্ডেনের বাইরে, রাস্তা দিয়ে হাঁটি।

কেন যেন রজতের ওকে আজ বড় আপন বলে মনে হচ্ছে, আপনার নাম জানতে পারি?
–নাম! বলে, ইতস্তত করে বলল, রুপালী।
–না, আপনার নাম রুপালী বলে মনে হয় না।
–কেন?
–আপনাদের তো হাজারটা নাম, রজত বড় স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে চলেছে।
–কিছু ভেবে নিয়ে মেয়েটি বলল, অরুণা, সত্যি আমার নাম অরুণা, আর আপনার নাম?
–অজয়, রজত চট করে উত্তর দেয়।
–বা, আপনিও বানানো নাম বলে দিলেন! অবশ্য বলার ইচ্ছে না থাকলে থাক, বলতে হবে না, আমি না হয় অজয়দা বলেই ডাকব।
–থাকো কোথায় তুমি? রজত নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, সে কখন আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে! তবু সামলে নেবার চেষ্টা করল, সরি, তুমি বলে ফেললাম!
–ভালো লাগছে, আমিও অভিনয়ে না হয় আপনাকে তুমি ডাকব, বুঝেছ! কেমন চোখকে প্রেমিকার মত ঈষৎ নাচিয়ে উঠলো অরুণা।
–ঠিক আছে, কোনো আপত্তি নেই, হেসে বলে রজত।
রজত থামল এক জায়গায়, দু ঠোঙা ঝালমুড়ি কিনে নিল। অরুণার হাতে এক ঠোঙা দিয়ে, নিজে একটা নিয়ে প্রেমালাপ করতে করতে ওরা হেঁটে চলল বেশ সময় ধরে। আস্তে আস্তে রাত বাড়তে লাগলো, অরুণার হয়তো ঘরে ফেরার সময় হয়েছে।
–অরুণা, ঘরে ফেরার তোমার সময় হল, না?
–হ্যাঁ, রাত হয়ে গেল।
–তুমি কোথায় যাবে অরুণা, মানে তোমার ঘর কোন দিকে?
–আমাদের লাইনে, কিছুই সত্যি বলতে নেই, তবে অজয়দা, আমি সত্যি বলছি তোমায়, আমি চাঁদনী মার্কেটের দিকে থাকি, এখান থেকে কাছেই, একটা বস্তী বাড়িতে।
–আমি বেহালা, পর্ণশ্রী থাকি, কাকার বাড়ি, বেহালা কলেজের পাশেই।
অরুণা কিছু ভেবে নিয়ে বলল, তা হলে বিদায় নিতে হয়!
–হ্যাঁ, চল আমরা বাড়ি ফিরি। পকেটে হাত ঢুকালো রজত, পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করল, দেবার জন্য অরুণার দিকে হাত বাড়ালো।
অরুণা কি ভেবে থমকে দাঁড়াল, রজতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আজ নয় অজয়দা, অন্য একদিন। আজ তো সত্যিকারের বন্ধু হয়ে ঘুরলাম, আমার অভিনয় আজ অভিনয় হয়ে উঠতে পারেনি।
–তা হয় না অরুণা, তোমার সংসার আছে, হয়তো স্বামী ছেলে মেয়ে…
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল রজত। মাঝখানে অরুণা বলে উঠলো, না, অজয়দা আমি অবিবাহিতা, আমার মা আছে, এক ছোট ভাই আছে, মা আমার বিছানায় শয্যাশায়ী…
–তোমার টাকার খুব প্রয়োজন অরুণা, রাখ এটা, রজত আবার এগিয়ে ধরে টাকাটা অরুণার সামনে।
–না, অজয়দা আজ নয়, আজ তোমার কাছ থেকে কিছুতেই টাকা নিতে পারব না।
–আবার কবে দেখা হবে অরুণা?
–মন থেকে চাইলে কোথাও না কোথাও কখনো না কখনও ঠিক দেখা হয়ে যাবে অজয়দা!
উভয়ের নীরবতায় কেটে গেল কিছু সময়।
–আমি আসি, বলে অরুণা কয়েক মুহূর্ত রজতের দিকে তাকিয়ে থাকল, মনের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার, ঘরে ফেরার তাগিদে এগিয়ে গেল রাস্তা ধরে, আর পরক্ষণেই ভীড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

রজত দেখেছিল, অরুণার চোখের কোণদুটি জলের আভায় চকচক করছিল, কেন যেন মনে হয়েছিল নিজের আসল নামটা অরুণাকে বলে দেয় সে। সময় আর সুযোগের অভাবে তা আর বলা হল না।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে, রজতের মনে আজও সে কথা স্মৃতি হয়ে থেকে গেছে।

শুক্তি দত্ত

 

পূর্বকথাঃ ইন্দিরার গল্প তো সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমবাবু অনেক দিন আগেই বলে গেছেন। তদানীন্তন প্রথানুযায়ী হরমোহন দত্তের প্রথমা কন্যা ইন্দিরার শৈশবেই বিবাহ হয়েছিল বটে, কিন্তু অর্থগৌরবে তাঁর সমকক্ষ না হওয়াতে তিনি আদরের আত্মজাকে শ্বশুরঘরে পাঠাননি, বরং জামাই উপেন্দ্রবাবুকে উপযুক্ত উপার্জনে প্রতিষ্ঠিত হবার পর ইন্দিরাকে নিয়ে যাবার উপদেশ দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা ইন্দিরার শ্বশুরের কাছে অত্যন্ত অপমানকর মনে হলেও ধনী বেয়াইএর বিরুদ্ধাচরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা; অগত্যা তিনি চুপ করে এই অপমান হজম করেন। উপেন্দ্রবাবু অধিকতর উপার্জনের আশায় ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে যান এবং যথেষ্ট অর্থোপার্জনপূর্বক বাড়ি ফিরলে ইন্দিরার উনিশ বছর বয়েসে সে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাত্রা করে। কিন্তু পথে কালাদিঘী নামে এক পুকুরের কাছে ভয়ঙ্কর ডাকাতিতে ইন্দিরার সর্বস্ব লুঠ হয়ে যায়, এবং জনবিরল জায়গায় তাকে ফেলে ডাকাতরা চলে যায়। ইন্দিরার কোনো বাড়িতেই আর ফেরা হয়না। কালক্রমে ইন্দিরাকে দেখা যায় কলকাতার রামরাম দত্তের বাড়িতে কর্মরতা দাসী হিসেবে। এখানে সে একমাত্র পুত্রবধূ অশেষগুণশালিনী সুভাষিনীকে পায় সত্যিকারের শুভাকাঙ্খিনী সখীরূপে, এবং তারই প্রচেষ্টায় অনেক ঘনঘটার পর ইন্দিরা বাপের বাড়ি ফিরে যায় ও পরিশেষে স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতেও সুপ্রতিষ্ঠিতা হয়। বঙ্কিমবাবু তো ইন্দিরা-উপেন্দ্রর সম্মিলিত সুখী দাম্পত্য জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেছেন; কিন্তু অবিমিশ্র সুখ বিধাতা কোন মানুষের ভাগ্যেই লেখেন কি? এই উত্তর-কথায় আসুন দেখি ইন্দিরা কেমন আছে।

ইন্দিরা চুপচাপ বসেছিলো আরামকেদারাতে। পশ্চিমের এই বারান্দাটা তার খুব প্রিয়। শ্বশুরের আমলের এই আরামকেদারাটা বোধহয় তার সব মানসিক বিচলনের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আজ অনেকদিন পর উ-বাবু কলকাতা গেছেন বিশেষ এক মামলার কাজে। একরাত থাকতে হবে সেখানে। আজ রাতে এই বিশাল বাড়িটাতে ইন্দিরা একা। কালাদিঘীর ঘটনাটা যদিও আজ প্রায়বিস্মৃত এক অতীত, ইন্দিরার মনে এর জন্য আর কোনো কালো ছায়া নেই, কিন্তু এই কষ্টটা তার মনে কখনো সখনো ভেসে আসে যে এই ঘটনায় তার সুখকল্পিত প্রথম প্রিয়মিলন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল।

ইন্দিরা কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর আর কোনো গণ্ডগোল ঘটেনি তার জীবনে। সময় তার থেকে যা নিয়েছিল তার চতুর্গুণ দিয়ে তার জীবন ভরিয়ে দিয়েছিল। শ্বশুরের স্নেহ, স্বামীর ভালোবাসায় তার সুখের ভরা উপচে উঠেছিলো। বাড়ির দাসদাসীরা তার ব্যবহারে খুবই তুষ্ট ছিল আর তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতো। তবে একটা বেশ বড় কষ্টতো তার ছিলোই। তার সন্তান হয়নি। এই অভাবটা একজন মহিলার পক্ষে নিশ্চয়ই খুবই বড়, কিন্তু যে স্বামীকে পাবার কোনো আশা ছিলনা, তাকে এরকম অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে তার মনে অন্য কোনো চিন্তাই স্থান পায়নি। স্বামী-শ্বশুরের আদরেই সে পূর্ণ ছিল।

বিকেলের ছায়া প্রলম্বিত হয়ে সন্ধ্যার আঁধারকে দীর্ঘায়িত করছে, দাসী এসে খবর দিল, “মা, একটা বুড়ো মানুষ তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।” ইন্দিরার মগ্নতা ভেঙ্গে গেল। অলস গলায় বলল, “বাবু বাড়ি নেই, এমন সময় কে এল আমার সাথে দেখা করতে? বলে দে, কাল বাবু ফিরলে আসতে।” দাসী বলল, “বলেছিনু মা, কিন্তু বুড়োটা নাছোড়বান্দা। বলে কিনা, মার সঙ্গে দেখা করাটা আজই দরকার।” ইন্দিরা একটু বিরক্ত হলেও শেষে বলল, “বৈঠকখানা ঘরে আলো দে আর লোকটিকে সেখানেই আসতে বল।”

অতবড় ঘরটা একটা মাত্র বাতিতে কি উজ্জ্বল হয়? ইন্দিরার বসার জায়গা ছাড়া বাকি ঘরে একটু ভৌতিকভাবে ছায়াটা নাচতে লাগল। তার মধ্যে বয়স্ক অথচ ঋজু চেহারার লোকটি উবু হয়ে অপেক্ষা করছিল। ইচ্ছে করেই একটু দেরী করে ইন্দিরা ঘরে ঢুকল। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে তাকে নমস্কার জানাল। ইন্দিরা বলল, “কি ব্যাপার, বাবু বাড়ি নেই। তোমার দরকারটা বাবুকে বললেই তো ভাল করতে।”

“না মাজননী, দরকারটা আমার আপনার সাথেই। আমি বাবু বাড়ি নেই জেনেই এসেছি। দীর্ঘকাল একটা অপরাধের বোঝা মনের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে। বলতে পারিনি কাউকে। বাপের পাপে একমাত্র মেয়েটার জীবন ছারখার হয়ে গেল। শেষে আজ তোমার কাছে কবুল করতে এলাম। মাগো, তুমি ক্ষমা না করলে আমার শান্তি নেই।”

ইন্দিরা একটু অবাক হল। তার কাছে কিসের অপরাধ? সেতো লোকটাকে চেনেই না। ঈষৎ বিব্রত স্বরে বলল, “আমি তো বুঝতেই পারছিনা কোন অপরাধের কথা তুমি বলছ?”

লোকটা একটু চুপ থেকে বলল, “কালাদিঘীর কথা।”
ইন্দিরা চমকে উঠল। ঘরে বাজ পড়লেও সে এতো ধাক্কা খেতো না। অস্ফুটে বলল, “কালাদিঘী? হঠাৎ আজ আবার কালাদিঘী?”
“মা, তুমি সেদিন প্রথম স্বামীর কাছে যাচ্ছিলে। কত স্বপ্ন ছিল তোমার মনে। আমি তোমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়েছিলাম সেদিন।”
“আজ এতদিন পর সেকথা বলে কি লাভ?” অস্ফুটে বলল ইন্দিরা।
“আমি জানি, মা। ঈশ্বরের কৃপায় তোমার সব দুঃখ মুছে গেছে। কিন্তু আমার পাপ তো যায়নি। আজ সেই পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছি। তোমার মত সতীলক্ষ্মী আমায় নিজমুখে ক্ষমা না করলে আমার সন্তানের জীবন শেষ হয়ে যাবে।”
“আমার তোমার উপর কোনো রাগ বা কষ্ট নেই বাছা। তুমি ভালো থেকো। এখন এস।”

লোকটি উঠল না। ধীরে ধীরে বলল, “মা একটা কথা তোমায় নিবেদন করতে চাই, আমি পাপ করেছি। তার শাস্তিও পেয়েছি। কিন্তু একাজ আমি নিজের ইচ্ছেয় করিনি। যিনি একাজ করতে আমায় হুকুম করেছিলেন…”
“হুকুম?” ইন্দিরা সোজা হয়ে বসল। লোক দিয়ে তার ক্ষতি করার চিন্তা কার মাথায় এল? কেনই বা এল? সে তো কারোর কোনো ক্ষতি করেনি। অতো ছোটো বয়সে অন্তঃপুরবাসিনী একটি মেয়ে, যার সঙ্গী ছিল শুধু মা, বাবা, ছোট বোন ও কয়েকজন দাসী, কারো শত্রু হয়ে গেল কেন ?
লোকটির গলা ভেসে এলো, “তিনি আর কেউ নন মা, তোমার শ্বশুর।”
“কিন্তু কেন,” আর্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল ইন্দিরা, “আমি তো ওঁর কোনো ক্ষতি করিনি!”
“ক্ষতি তুমি কেন করবে মা,” লোকটি বলে চলে, “তোমার শ্বশুরের শত্রুতা তোমার বাপের সঙ্গে। অবশ্য এই শত্রুতার কথা তোমার বাপও জানতেন না।”
“তাহলে?”
“তোমার মনে আছে তো, বিয়ের পর তোমার বাবা তোমায় শ্বশুরঘরে পাঠাননি তোমার স্বামীর রোজগার ভালো ছিলনা বলে। কর্তামশাই তোমায় আনতে যে লোক পাঠিয়েছিলেন তাকে তিনি হাসতে হাসতে ভালভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তোমায় উপযুক্তরূপে প্রতিপালন করার ক্ষমতা হলে তবেই তিনি তোমাকে স্বামীর ঘরে পাঠাবেন। কর্তামশাই এতে খুবই অপমানিত হয়েছিলেন আর সেই রাগ তিনি ভোলেননি। তিনি আবার ছেলের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু খোকাবাবু তাতে একেবারেই বেঁকে বসেন। বেশি চাপাচাপির ফলে তিনি রাগ করে পড়াশোনার নাম করে পশ্চিমে চলে যান। শুনেছি সেখানে গিয়ে তিনি খুব উন্নতি করেছিলেন। এরপরই কর্তামশাই আবার বেয়াইবাড়ি লোক পাঠান তোমাকে আনার জন্য। কিন্তু আসলে তাঁর মনে অন্য কথা খেলা করছিল।”
“এতো কথা তুমি জানলে কি করে?”
“একথা কর্তাবাবু আমায় নিজমুখে জানালেন যে। আর কালাদিঘীতে ডাকাতির পরিকল্পনাটাও সেখনেই স্থির করা হল।”

এসব শুনতে শুনতে ইন্দিরা ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। কিন্তু সে অভিজাত ও জমিদার পরিবারের মেয়ে এবং বর্তমানে একটি পরিবারের সর্বময়ী কর্ত্রীও বটে। নিজেকে সংযত করার অভ্যাস তার সহজাত। খানিক সামলে সে বলল, “এসব কি বাজে কথা বলছো। এতোদিন পর, যে মানুষটি স্বর্গে গেছেন, তাঁর নামে এই দুর্নাম করতে তোমার বাধছে না?”
অপরাধী গলায় লোকটি বলল, “মাগো, কর্তাবাবু শরীরে থাকতে এসব বলার তো কোনো প্রশ্নই নেই। তাছাড়া তখন আমার মধ্যবয়স। মনে কোনো পাপবোধ ছিলনা। মালিকের হুকুম তামিল করেছি, এই তো আমার কাজ। কিন্তু আজ বৃদ্ধ বয়সে মনে হয় সব দায় মালিকের উপর দিয়ে বোধহয় সারা যায় না। আমার মেয়েটির সংসার যখন হঠাৎ করে ছারখার হয়ে গেল, সেদিন আমার নতুন করে তোমার সাজানো মুখখানা মনে পড়ল। হাত জোড় করে তোমার সেই করুণ কান্না আমার পিঠে চাবুক মারছিল। আমরা তো তোমার এয়োতির চিহ্ন শাঁখা লোহাটুকুও ছাড়িনি সোনার জন্য। এতোদিন তো তোমায় একলা পাইনি, আজ খোকাবাবু বাড়ি নেই বলে তোমার কাছে বোঝা নামিয়ে মাপ চাইতে এসেছি।”

বাইরে তখন ধূসর অন্ধকার। ঘরের থমথমে আবহাওয়াকে ভেঙ্গে দিয়ে ইন্দিরা উঠে দাঁড়াল। একটা কথাও না বলে বাইরে গিয়ে একজন দাসীকে হুকুম করল লোকটিকে কিছু খেতে দিতে। অন্য একজনের হাতে একটা খামে কিছু টাকা ভরে লোকটির হাতে তার মেয়ের নাম করে দেবার জন্য পাঠিয়ে দিল। সে আর বাইরে এল না। তার মনের ভিতর কষ্টের ঝড় বইছিল। শ্বশুরকে সে খুবই ভালোবাসতো। কিন্তু তিনি যে এমন ভেবেছিলেন কে জানতো।

একটা ফোনের শব্দে তার চটকা ভেঙ্গে গেল। কোলকাতা থেকে উ-বাবুর ফোন, তিনি কাজ শেষ না হওয়াতে কালকের বদলে পরশু ফিরবেন। ইন্দিরা ঠিক বুঝতে পারল না সে এই খবরে খুশি না দুঃখিত – কোনটা হবে। তবে এই মানসিক অবস্থায় স্বামীর মুখোমুখি হতে হোলো না বলে নিশ্চিতভাবেই স্বস্তি বোধ করল। এক গ্লাস জল খেয়ে সে একটু সুস্থিত হয়ে ফোনে যোগাযোগ করল তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলির একমাত্র সাথীকে। একমাত্র তাকেই সব খুলে বলা যায়। “ওখান থেকে আমার বাড়ি মাত্র দু’ঘন্টার পথ। তুমি শীগগির এসো। এই অন্ধকারে তুমি ছাড়া আর কোনো আলো নেই,” ফোনের মধ্য দিয়ে ইন্দিরার আর্তি আছড়ে পড়ল।

সুভাষিণী খুব অবাক হল। ইন্দিরার এবম্বিধ বিচলন! ইন্দিরাকে সে খুব শক্ত মনের মেয়ে বলে জানত। সে স্থির থাকতে পারল না। তার ছেলে এখন হস্টেলে থাকে। তাই তার তেমন চাপ নেই। আর র-বাবুর সহযোগিতার কথা তো বঙ্কিমবাবুই লিখে গেছেন। সে একটা চিরকুট লিখে রেখে দৌড়াল। কিন্তু পথ যে আর ফুরায় না। ইন্দিরার বাড়ী পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে দোতলায় উঠে সে ‘বেয়ান, বেয়ান’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। সবাই জানে, সে খুব হাসিখুশি ধরনের মেয়ে। ইন্দিরার মুখোমুখি হয়ে সে খুব অবাক হয়ে গেল। একি চেহারা হয়েছে তার সখীর! চোখ ফুলে লাল; মুখ কালিবর্ণ। হাত ধরে সুভাষিণীকে ঘরে নিয়ে গিয়ে ইন্দিরা দরজা বন্ধ করল, তারপর সখীর কোলের উপর অঝোরে ভেঙ্গে পড়ল।

সুভাষিণী কিছুই জিজ্ঞাসা করল না। শুধু হাত বুলিয়ে মাথায় দিতে লাগল। ইন্দিরাকে সময় দিল কান্নার মধ্য দিয়ে তার আবেগ ফুরিয়ে ফেলার। একসময় ইন্দিরা উঠে বসল। তারপর ভাঙ্গা গলায় বলল, “অনেকক্ষণ এসেছো দিদি, কিছু খেতে দিতে বলি।” সুভাষিণী হাত তুলে বারণ করে বলল, “আগে বল, কি হয়েছে, কেন ডেকেছিস।” ইন্দিরা আবার একটু ফোঁপালো, একটু সময় চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে সব কিছু খুলে বলল। সুভাষিণী শুনতে শুনতে বুঝতে পারল গণ্ডগোলটা কোথায় হয়েছে। ইন্দিরা সরলা। তিল তিল করে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় যে মন্দির সে মনের মধ্যে গড়ে তুলেছিল, সেখানে সে তার প্রিয়জনদের নিজের মনের মাধুরী মিশিয়েই প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় অন্য সকলের মত করে তার জীবন শুরু হয়নি, এই ঘাটতি সে প্রাণপণে পূর্ণ করার চেষ্টা করত। সে দেখেছিল তার শ্বশুর তাকে কত ভালোবাসতেন। সে তাঁকে বিশ্বাস করেছিল। আজ সেই দেবতার বিচ্যুতি, তার বিরুদ্ধে সেই শ্বশুরের ষড়যন্ত্রমূলক ভাবনা, কাজ তার সেই বিশ্বাসকে চূর্ণ করে দিয়েছে। এই আঘাত তার সহ্য হয়নি।

সুভাষিনী একটু হেসে ইন্দিরাকে টেনে তুলল। যত্ন করে মুখ মুছিয়ে দিল। তারপর বলল, “তুই কি বোকা রে, শুনলি না, উ-বাবু আবার বিয়ে করতে চাননি বলেই পশ্চিমে চলে গিয়েছিলেন। আরে সেই তো তোর আসল জোর। দেখ, তার ভালোবাসার কত জোর যে তুই আবার ফিরে এলি তার জীবনে!” আদর করে ইন্দিরার মুখটা নেড়ে দিল সে। সত্যিই তো, একথাটা তো তার মাথায় আসেনি, তৃতীয়ার শশীর মত ক্ষীণ হাসি ভেসে উঠল ইন্দিরার মুখে। ধীরে ধীরে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে। সে সুভাষিণীকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ধন্যি দিদি, আবার মনে পড়ল তুমি র-বাবুর প্রধানমন্ত্রী। তোমায় পেন্নাম।” দুহাতে চুলের গোছাকে খোঁপায় বেঁধে উঠে দাঁড়াল সে, “যাই, তোমার জন্য কিছু রাঁধিগে। সেই কখন এসেছো, আর আমায় দেখো? নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, ছি!”

দুই সখী হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে ঢলতে ঢলতে রান্নাঘরের দিকে চলল।

সুগত সান্যাল

 

গল্পের নাম পড়ে যদি ভেবে থাকেন আমি কলকাতার ইডেন গার্ডেনে আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি এবং সেখানে ডাইনোসর দেখাবো, সেটা মারাত্মক ভুল হবে। এই ঘটনা আরো অনেক গভীর।
আমার বন্ধু প্রফেসর প্রশান্ত বোস একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক। ওঁর একটা পি এইচ ডি ডিগ্রি আছে পদার্থবিদ্যাতে। তবে আমি ভেবে পাই না যে পৃথিবীর কোন বিষয়টা ওঁর অজানা। মলিকিউলার বায়োলজি থেকে থিওরি অফ রিলেটিভিটি, সবেতেই ওনার সমান আগ্রহ।
আমি কমলেশ মিত্র, প্রশান্ত বাবুর বাড়ির কাছে একটা ছোট মেসে থাকি। বি কম পাস করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কেরানির কাজ করি। উনি আমায় বেশ ভালোবাসেন কিন্তু সেটা যে কেন আমি বুঝতে পারি না। উনি তো ইচ্ছে করলেই অনেক বাঘা বাঘা লোকের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন। তবে হ্যাঁ, উনি যখন কথা বলেন, আমি সাধারণতঃ চুপচাপ থাকি, মন দিয়ে সব কথা শুনি, আর মাঝে মধ্যে ‘হাঁ’ ‘না’ বলে নিজের অস্তিত্ব জানান দিই। প্রফেসর বোস অনেক কিছু বলে যান, উনি জানেন আমার কাছ থেকে কোন খবর কারো কাছে যাবে না। আগে অনেক লোক ওঁর সঙ্গে কথা বলে বুদ্ধি নিয়েছে আর তারপর যন্ত্রপাতি তৈরি করে টু-পাইস ইনকাম করেছে। প্রফেসর বোস টাকা অথবা খ্যাতি, এসবের জন্য পরোয়া করেননা। ওঁর নিজের প্রচুর টাকা, আর বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকেও প্রচুর পেয়েছেন। ব্যক্তিগত নাম-ডাকের কোন মোহও ওঁর নেই। তবে কেউ ওঁকে বোকা বানিয়ে চলে যাবে সেটা উনি সহ্য করতে পারেন না। অসৎ লোকের ধারে কাছে উনি থাকেন না।
প্রশান্ত বাবুর একটা ভালো অভ্যাস আছে। উনি যদিও থিয়োরিটিক্যাল বিষয়ে পি এইচ ডি করেছেন, বিভিন্ন ধরণের যন্ত্র তৈরি করা ওঁর সখ এবং উনি তাতে খুব আনন্দ পান। মানসিক ইচ্ছা দিয়ে চালানো যে ওভেন এবং টোস্টার উনি তৈরি করেছেন, সেটা দেখলে লোকে পাগল হয়ে যাবে। তবে আমি কঠিন ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কাউকে কোন দিন কিছু বলতে পারব না, আর আমিও কখনো ওঁর বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি।

একদিন সন্ধ্যাবেলা মুশলধারে বৃষ্টি নেমেছে, আমি এসে জমে গেছি, খুব গল্প হচ্ছে। নরহরি, ওঁর কাজের লোক, এক থালা চিকেন পকৌড়া দিয়ে গেছে। এখানে এলে আমার খাওয়াটা বেশ জমাটি হয়। ছুটির দিনে দুপুরের আর প্রায় প্রতি রাতেরই খাওয়া আমার এখানেই হয়।
সেদিন উনি হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কমলেশবাবু, আপনার কি বহু পুরনো দিনের জীবন্ত প্রাণী দেখতে ইচ্ছে করে?”
আমি ভাবলাম, এবার আবার নতুন কি চিন্তা ওঁর মাথায় খেলছে। এত বড় এক জন প্রতিভাশালী মানুষের ভাবনার ধারা বোঝা শক্ত। আমি বললাম, আমার ইচ্ছে করে পিরামিড তৈরি, তাজমহল তৈরি হওয়া দেখতে। দা ভিঞ্চি মোনালিসা আঁকছেন দেখতে পেলেও ভালো লাগবে।
প্রশান্তবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন। ওঁর বক্তব্য হোল যে আমার চিন্তাধারার মাপটা ছোটো। আমি শুধু কয়েক হাজার বছরের গণ্ডীতে ভাবছি। আর ওঁর মন ভাবছে লাখ লাখ অথবা কোটি কোটি বছরের মাপে। আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে আমি এই মাপে ভাবিনি। আমি সহজে হার স্বীকার করাতে উনি খুশী হয়ে ওঁর চিন্তাধারার রাশ আলগা করলেন। আমি বহুবার দেখেছি যে এটাই সব থেকে সহজ।

উনি বললেন যে উনি বহুদিন ধরে এই নিয়ে চিন্তা করে আসছেন। আর অনেক কিছু কাজ এবং অঙ্ক কষে ফেলেছেন, এরই মধ্যে। আমি অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি দেখেছি যে ওঁর চিন্তাধারার গতি এবং দিক বোঝা শক্ত। তার চেয়ে সহজ হল ওঁকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়া। আর তাতে উনিও খুব খুশী হন। ওঁর আনন্দ হল একদম নতুন কিছু তৈরি করায়, যে সব জিনিষ সাধারণ লোক কল্পনাও করতে পারবেনা। টাকা বা যশ, এসবে ওঁর কোন মোহ নেই। তাই উনি পেপার লেখা বা পেটেন্ট নেওয়ার ব্যাপারে খুবই উদাসীন এবং শুধু মুষ্টিমেয় কিছু বৈজ্ঞানিকই ওঁর খ্যাতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল।
বেশ কিছু বছর আগে উনি ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। আমরা দুজনে সেই যন্ত্র চড়ে ‘আলাস্কা’ ঘুরে এসেছিলাম। কিন্তু এতো বেশি ঠাণ্ডা সেখানে যে আমি ওঁকে প্রায় পায়ে ধরে ফেরৎ এসেছিলাম, কিছুই দেখা হয়নি। ওঁর তৈরি ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্রটা দেখতে খুবই সাধারণ, একটা পুরনো কার্পেটের মতন। উনি ওই কার্পেটের ওপর এক বিশেষ পদ্ধতিতে একটা রাসায়নিকের সংযোজনা করেছেন, তা ছাড়া কিছু দিক এবং গতি পরিবর্তনের যন্ত্র লাগানো আছে, তার বিশদ বিবরণ শুধু উনিই জানেন। আজকাল ওটাকে দিয়ে ওঁদের দাদুর আমলের পিয়ানোটা ঢাকা থাকে, তাতে লোকের বিশেষ নজরে পড়েনা। উনি সব সময়ে ওঁর এই ঘরটি নিজের তৈরি ‘ম্যাজিক তালা’ দিয়ে বন্ধ করে রাখেন। এই তালার একটা মহা গুণ হোলো যেই প্রধান দরজাটাতে ম্যাজিক তালা পড়ে, বাকী দরজা ও জানলাগুলো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। আমি এর সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারবো না, কিন্তু একটা মজার কথা বলি, কেউ যদি কোনও জানলা বা দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করে, তার কপালে জোটে এক রাম চড়। বেশ জোরাল চড়। আমি চড় খাওয়া লোকের কান্নার শব্দ শুনছি। আমরা সেদিন অন্য ঘরে বসেছিলাম।

ভাগ্যবশতঃ, প্রশান্ত বাবু আমাকে খুব স্নেহের চক্ষে দ্যাখেন। আমাকে কোনও জিনিস বোঝাতে হলে উনি একদম সহজ করে শুরু করেন। আর শেষ অব্দি আমিও বুঝে যাই। ওঁর বোঝানর ক্ষমতাও অসাধারণ। এর সব কিছুর শুরুতে হচ্ছে আমার ওপর ওঁর বিশ্বাস।
উনি আমাকে বললেন, “কমলেশবাবু, আমি একটা যন্ত্রের কথা ভাবছি, যেটা আমাদের অতীতে… বহু প্রাচীন সময়ে কি ঘটেছিল, সেটা দেখতে সাহায্য করবে।” আমি একটু অবাক হলাম। আমি এই ধরণের যন্ত্রের কথা গল্পের বইয়ে পড়েছি, তবে কারো সঙ্গে এই নিয়ে কখনো কথা হয়নি। আরো জানার আগ্রহে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এই যন্ত্রের ব্যাপারটা একটু বিশদে জানান না, সহজ করে, আমার বোঝার মতন করে।”
“এটা খুবই সহজ ব্যাপার। আমি বেশ কিছুদিন হোলো, এর বৈজ্ঞানিক থিওরি, সব অঙ্ক কষে ঠিক করে রেখেছি,” প্রশান্ত বাবু জানালেন। “আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আপনি তো শুনেছেন লোকে বলে যে ‘তারা’ বিস্ফোরণ হওয়া দেখেছে। বৈজ্ঞানিকরা এই ঘটনাকে ‘সুপারনোভা’ বলে থাকেন। আসলে আপনি যেটা এখন দেখছেন, সেই তারার বিস্ফোরণ হয়তো কোটি কোটি বছর আগে হয়েছে, এবং সেই আলো এত বছর বাদে এসে আমাদের কাছে দেখা দিয়েছে। আপনি যেটা এখন দেখছেন, সেই বিস্ফোরিত তারা এখন পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছে, বহুদিন আগে।”
আমি খুব বাধ্য ছেলের মতন মাথা নাড়ালাম। সত্যি কথা বলতে কি, কোটি কোটি বছর আগে তারার বিস্ফোরণ এবং আমাদের বহু প্রাচীন জীবিত প্রাণী দেখা, আমি এর মধ্যে কোন সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে ঠিক সময়ে প্রশান্ত বাবু নিজেই সব সমাধান করে দিয়ে থাকেন।
প্রশান্ত বোস আরো বিশদভাবে এই অতীতের জীব দেখবার ব্যাপারটা বোঝাতে শুরু করলেন। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমার সেই ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্রের কথা মনে আছে কিনা? আমি জোরে ঘাড় নাড়লাম, আমি কি করে সেই ‘আলাস্কা’ ভ্রমণের কথা ভুলে যাব।
প্রশান্ত বাবু জানালেন যে আমরা যদি পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে যেতে পারি, তাহলে আমদের বহু পুরনো দিনের ঘটনা দেখতে পাওয়া উচিৎ। আমি এবার আরো জোরে ঘাড় নাড়লাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন মাথাতে সমানে পাক মারছিল, অত দূর থেকে আমরা পৃথিবীতে কিছু দেখব কেমন করে? আমি ওঁকে এটা জিজ্ঞেস করলাম।
উনি আমার এই প্রশ্ন শুনে খুব খুশী হয়ে উঠলেন। বললেন, “খুব ভাল বলেছেন, এটা তো মাথাতেই আসেনি। শুধু দূরে যাওয়াটা নিয়েই ভেবেছি।” ওঁর মতন একজন বড় বৈজ্ঞানিক এই বিরাট প্রয়োজনীয় ব্যাপারটা ভুলে গেছিলেন, তাতে ওঁর বিন্দুমাত্র ক্ষোভ হয় নি। উল্টে উনি আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমারও বেশ খুশী খুশী লাগছিল। উনি বললেন এটার উত্তর খুঁজে পেতে কিছু সময় লাগবে। আমি রাজী হয়ে গেলাম।

সেদিন ছিল শুক্রবার, তারপর একটা পুরো সপ্তাহ কেটে গেলো, কিন্তু প্রশান্ত বাবুর কোন খবর নেই। আমি এক দিন ওঁর বাড়ি গিয়ে নরহরিকে জিজ্ঞেস করে এলাম, সেও কোন কিছু বলতে পারলো না। খালি বলল যে সে মাঝে মাঝে প্রশান্ত বাবুকে পাতলা কাঁচ অথবা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল জাতীয় জিনিস নিয়ে বাড়ীতে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেছে। নরহরি ঠিক পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারলো না। আমিও বুঝলাম যে অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আমাদের আর কিছু করার নেই।

পরের সপ্তাহের সোমবার সকালবেলায় হঠাৎ ডাক এলো। মেসের ম্যানেজার বাবুর ঘরে দেখি নরহরি, হাঁপাচ্ছে, এক গ্লাস জল শেষ করে আর এক গ্লাস জল খাচ্ছে। আমাকে বলল যে প্রশান্ত বাবু আমাকে এখুনি ওর সঙ্গে যেতে অনুরোধ করেছেন। আমি যেন কয়েক দিনের মতন কাপড়-জামা নিয়ে যাই। বুঝতে পারলাম যে আমাদের আবার অনির্দেশ যাত্রার পালা এসেছে।
আমি অবশ্য মনে মনে এই যাত্রার জন্য তৈরি ছিলাম। কথা বলে সময় নষ্ট না করে আমি দু-তিনটি শার্ট-প্যান্ট নিয়ে নিলাম। আর আলাস্কার অভিজ্ঞতা মনে রেখে আমার ঠাকুরদাদার দেওয়া একটি বিশাল ওভারকোটও নিলাম। এই ওভারকোট উনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সৈন্যদের ‘ওয়ার-সারপ্লাস’ দোকান থেকে কিনেছিলেন, ওঁর পরে বাবা, বাবার পরে এটা এখন আমার কাছে এসেছে। তবে কে জানতো যে আমাদের এইবারের ভ্রমণের পরিধি অনেক অনেক বেশি হবে।
প্রশান্তবাবুর বাড়ী গিয়ে দেখি উনি বেশ উত্তেজিত। সমানে পায়চারি করছেন বসার ঘরেতে। এক কোনে দুটি অদ্ভুত যন্ত্র রাখা আছে। এর মধ্যে একটা আমাদের পুরনো ম্যাজিক কার্পেট। সেটাকে ঝাড় পোঁছ করা হয়েছে আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচার মত জিনিসের মাথায় সেটা রাখা রয়েছে। খাঁচার সামনেটা খোলা। ভেতরে দুটি বসার জায়গা রয়েছে। অনেকটা যেন পালকির মতন দেখাচ্ছে। আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করাতে উনি ওনার মার্কামারা সূক্ষ্ম হাসিটা হাসলেন। “মনে পড়ে কমলেশ বাবু, গত বার আলাস্কা থেকে ফেরার পথে আপনি কার্পেট থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমরা খুব দ্রুত বেগে আর অনেক উঁচু দিয়ে আসছিলাম। তাই এবারে এই ব্যবস্থা করেছি। এতে আমরা একটু আরামে বসতেও পারব আর মজা করে সারা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে ঘুরতেও পারবো।” ঘটনাটা যদিও মজার বলে মনে হচ্ছিল না, কিন্তু মনে হোল এখন চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই আস্তে আস্তে পরিস্কার হবে, ওঁর পরের কথাতে কিছুটা আলোকপাত হোল।
“দেখুন কমলেশ বাবু, আমরা যদি অনেক পুরনো ঘটনা দেখতে চাই, তা হোলে আমাদের পৃথিবীর থেকে দূরে যেতে হবে, তাই না?” আমি সায় দিলাম। প্রশান্ত বাবু বললেন, “তা হলে ডাইনোসর দেখতে হলে আমাদের অনেক অনেক দূরে যেতে হবে।” দূরত্ব বোঝাতে উনি বেশ কিছু অঙ্ক আমাকে দেখাতে উৎসাহী হয়ে উঠছিলেন, আমি তাড়াতাড়ি বিষয়টা পালটে ফেললাম। অঙ্ক নিয়ে আমি কি করবো? আসল ঘটনা দেখতে পেলেই আমি খুশী।
“ইয়ে… বহু দূর থেকে দেখার ব্যাপারটা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। উনি একটা হাল্কা হাসিতে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে ওঁর ব্যাপারটা মনে আছে। উনি দুটো বাইনোকুলার জাতীয় যন্ত্র বের করলেন। আমি ভাবলাম যে এই দিয়ে কোটি কোটি মাইল দূর থেকে কি দেখা যাবে? আমার ছোটবেলায় একটা মেলা থেকে কেনা বাইনোকুলার ছিল। তাতে একটা আমগাছের ডালপালা পরিস্কার দেখা যেতো, তবে ফুট কুড়ির বেশি দূরের জিনিস দেখতে মোটেই সুবিধে হত না।
প্রশান্ত বাবু আমার মনের কথা বুঝে নিলেন। বললেন, “এই বাইনোকুলার সাধারণ জিনিস নয়। এটাতে একটা বিশেষ পদার্থ লাগান আছে, যেটা দূরত্ব অনুসারে দেখার জোর বাড়ায় বা কমায়। অতএব, আপনি একশো ফুট বা এক কোটি মাইল, যত দূর থেকেই দেখুন, আপনি একই রকম পরিস্কার ভাবে সব জিনিস দেখতে পাবেন।”
সকাল সকাল বিশাল পরিমাণ জলখাবার খেয়ে আমরা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করলাম। নরহরিকে বলা হোল যে কেউ যদি আমাদের খবর চায়, তাকে বলা হবে যে আমরা কমলেশ বাবুর গ্রামে বেড়াতে গেছি ।

প্রশান্ত বাবু আর আমি, দুজনে ম্যাজিক পালকিতে উঠে বসলাম। আমি ওভারকোটটাও পরে নিয়েছিলাম, আর প্রচণ্ড ঘামছিলাম। যাত্রা শুরুর আগে, আমি আমাদের সব দেব-দেবীকে মনে মনে প্রণাম করে নিয়েছি, প্রশান্ত বাবু এসবে খুব একটা বিশ্বাস করেন না।

অতীতের দিকে যাত্রা

আমাদের যাত্রা শুরু হোল। প্রশান্ত বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন অনেক দূর অতীতে যাবার আগে, আমি কোন কাছাকাছি ঘটনা দেখতে চাই কিনা। আমি বললাম প্রথমে পিরামিড তৈরী দেখতে চাই। প্রশান্ত বাবু ম্যাজিক পালকির কন্ট্রোল প্যানেলের সুইচ নিয়ে খুটখাট শুরু করলেন।
আমরা প্রচণ্ড গতিতে চলেছি। দূরে পৃথিবী একটা ছোটো বিন্দুর মতন দ্যাখাচ্ছে। আমাদের বিশেষ বাইনোকুলার দিয়ে দেখি বেশ পরিস্কার দেখাচ্ছে সব। আর এই যন্ত্রের একটা বিশেষ গুণ হোল, যে এটা মানুষের চিন্তাধারা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পৃথিবীর যে কোন একটা জায়গা দেখতে হোলে, সেই জায়গার কথা মনে করলেই সেখানকার ছবি ফুটে ওঠে। আমি মনে মনে পিরামিডের কথা চিন্তা করতে না করতেই দেখি কয়েক শো লোক বিরাট বিরাট পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জায়গাটা মোটেই মরুভূমি নয়, বেশ ঘাসে ঢাকা, আমি সন্দেহ প্রকাশ করাতে, প্রশান্ত বাবু জানালেন যে তখন ঐসব জায়গা বেশ সবুজ ছিল। মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে অনেক পরে। পিরামিড দেখা হোল খুব দ্রুত গতিতে।

আমরা পৃথিবী থেকে আরো অনেক দূরের দিকে পাড়ি শুরু করলাম। মাঝখানে মনে হোল যে এক ঝলক মায়া সভ্যতার আভাস দেখতে পেলাম। আমদের পালকি তখন প্রচণ্ড গতিতে চলেছে। প্রশান্ত বাবু ডাইনোসর দেখবার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। হঠাৎ দেখি দূরের পৃথিবীতে মানুয দেখা যাচ্ছে তবে তাদের চেহারা একটু অন্যরকম। তাদের দেখতে অনেক বড় এবং তারা কুঁজো হয়ে হাঁটছে। আমি বললাম, “প্রশান্ত বাবু, এরা কারা?” ঊনি ভাল করে তাকিয়ে দেখে বললেন যে এরা আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষ ।
বুঝলাম যে এসব দেখাও কপালে ছিল । অবশ্য প্রশান্ত বাবুর তৈরী ওই বাইনোকুলার না থাকলে এসব দেখা কপালে হোতো না ।

দেখতে দেখতে বেশ কিছু ঘণ্টা কেটে গেছে। আমার একটু ঘুম পেয়ে গেছিল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি যে পৃথিবীর একটা জায়গায় বেশ কিছু হাতির মতন জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে তারা হাতির থেকে আকারে অনেক বড় আর গলা বেশ লম্বা, অনেকটা জিরাফের মতন। আমার ঘুম পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে এই দেখে। আমি বুঝতে পারলাম যে আমরা ডাইনোসর বা ঐ জাতীয় কিছু জীবদের দেখছি। প্রশান্ত বাবুকে জিজ্ঞেস করাতে উনি সজোরে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
প্রশান্ত বাবু ম্যাজিক পালকি চালিয়েই চলেছেন। মুখে এক অদ্ভুত হাসি। আমি ভাবলাম যা দেখার জন্য আসা, সে সবই তো দেখা হোল, এবার তো ঘরে ফিরলেই হয়। প্রশান্ত বোস কোন কথা না বলে পালকির গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন।

আরো অতীতের দিকে

আমার ভ্রমণপর্বের এই অংশটা সব মনে নেই ঠিক মতন। যেটুকু মনে আছে তাতেই এখনো মাথা ঘুরে যায়। আমি এটুকু বুঝেছিলাম যে প্রশান্ত বাবু শুধু ডাইনোসর দেখেই থামবেন না, ওঁর মাথায় আরো কিছু দেখার মতলব আছে।
হঠাৎ আমার নজরে পড়লো যে পৃথিবীর কোথায় কে জানে সুন্দর বাগান। সেখানে গাছ, ফুল, ফল সব দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম এত সব দেখার পর এখন বাগান দেখে কি হবে! প্রশান্ত বাবুর মুখে হাসিটা লেগে আছে তবে চোখের দৃষ্টি কিরকম যেন। একটা জিনিস দেখতে পেয়ে আমি সোজা হয়ে বসলাম। একটা বিরাট সাপ এঁকে বেঁকে চলেছে, এদিক ওদিক ঘুরে একটা গাছে উঠতে লাগল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি ওটা একটা বিরাট আপেল গাছ।
আমার হঠাৎ মনে হল এটা সেই বিখ্যাত গার্ডেন অফ ইডেন নয় তো? দুটি মানুষকেও দেখতে পেলাম। প্রশান্ত বাবু ইচ্ছে করে ঐ মানুষদের একটু আবছা রেখেছেন। ওঁর যন্ত্রের কন্ট্রোল ঠিক করাতে দেখি যে আদম ও ইভকে দেখা যাচ্ছে, গায়ে কাপড়-জামা কিছু নেই। এটা আপেল খাওয়ার আগের অবস্থা ।
বলতে ভুলে গেছি, প্রশান্ত বাবু বিয়ে করেননি আর মেয়েদের সামনে উনি বেশ অপ্রতিভ হয়ে পড়েন, আর এখানে তো আরও মারাত্মক অবস্থা। সাপের বেশে শয়তান আর কিছু করার আগে, এবং ইভকে দিয়ে আদমকে আপেল খাওয়ানোর আগে, প্রশান্ত বোস তাঁর বৈজ্ঞানিকোচিত সংযম ভুলে গিয়ে কন্ট্রোলের যন্ত্রকে পুরো উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, আর আমাদের পালকি সোজা প্রশান্ত বাবুর বসার ঘরে এসে ধপাস করে পড়লো।
আমি হতভম্ব, এতবড় একটা ঘটনা দেখা হোল না। ওভারকোটটা খুলে ফেললাম। নরহরি কাছেই ছিল, তাকে বলতে না বলতে সে খুব কড়া চা আর খাবার নিয়ে এলো। এতটা ঘুরে আসার পরে আমাদের দুজনেরই খুব খিদে পেয়েছিল।

আমি প্রশান্ত বাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ডাইনোসর না আদম-ইভ, এদের কারা আগে এসেছিল, উনি উত্তর না দিয়ে অস্পষ্টভাবে খালি বললেন ওঁর ম্যাজিক পালকির কন্ট্রোলে একটু গন্ডগোল ছিল। ভেবেছিলাম যে এই পর্বের এখানেই ইতি, তা কিন্তু হোল না। কিছুদিন বাদে নরহরি ফের এসে উপস্থিত এবং আমি আবার গিয়ে পৌঁছলাম আমাদের আড্ডাখানায়। দেখলাম প্রশান্ত বাবু দুঃখী দুঃখী মুখ করে বসে আছেন ।

বর্তমান অবস্থা

আমি অনেক করে জিজ্ঞেস করাতে বললেন যে উনি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন। শয়তান স্বপ্নে এসে ওঁকে শাসিয়ে গেছে। বলেছে যে এরকম বিশ্রী অবস্থার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। সেই থেকে আমাদের অতীত ভ্রমণ বন্ধ।
আমরা আজকাল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেখানকার খাবার খাচ্ছি। পালকিতে একটা ছোট টুল লাগিয়ে নরহরিকেও মাঝে মাঝে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ লাগে। তবে এর মধ্যে একটা জায়গায় গেছলাম, যেখানকার লোকেরা কাঁচা খাবার খায়, সে এক বাজে অভিজ্ঞতা। ওখান থেকে ঘুরে আসার পর প্রশান্ত বাবু একটা নতুন সর্ব-হজম-ক্ষম বড়ি তৈরী করছেন!!!!

সুব্রত মজুমদার

 

মনে আছে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম যখন আমি কলেজের ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়তে ঢুকেছিলাম। কোলকাতার আশেপাশের কোন একটা ছোট জায়গা থেকে এসেছিল। মনে আছে এই কারণে নয় যে মেয়েটি ডাকসাইটে সুন্দরী বা অসাধারণ ভালো পড়াশুনায় ছিল বলে। বরঞ্চ উল্টোটাই বলা যেতে পারে। মেয়েটির চেহারার মধ্যে ছেলেদের আকর্ষণ করার মত বা মেয়েদের হিংসে করার মত কিছু ছিল না। সাধারণ সাজপোষাক পরে সাধারণ চেহারাটাকে আরও সাধারণ করে রাখত। মাথার চুলকে টেনে বেঁধে একটা বড় খোঁপা আর সাদা পোষাকেই সবসময়ে দেখতাম তাকে। কপালে দিত না টিপ ঠোঁটে মাখত না কোন রঙ। আমাদের ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যা ছিল এগারো, ওই মেয়েটি আসার পর হল বারো। আমরা ছেলেরা আড়ালে বলতাম দ্যা ডার্টি ডাজ্‌ন্‌। আমরা লক্ষ্য করলাম যে মেয়েটি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে না, নিজের মনে চুপচাপ উদাস হয়ে বসে থাকে। জোর করে প্রশ্ন করলে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে উত্তর দেয়। কথা বাড়াবার কোনরকম চেষ্টা করেনা। ওকে আমরা হাসতেও কখনো দেখিনি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেচে আলাপ করতে গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটির ঠান্ডা বরফের মত স্বভাবের জন্য বেশি দুর এগোতে পারেনি। অবশেষে সবাই একসময়ে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। মেয়েরা বলত ওর নাকি ভীষণ দেমাক, আমরা ছেলেরা সেকথা মানতাম না। মেয়েটির নাম জেনেছিলাম আশা। আমরা অনেক রকম নাম দিয়েছিলাম মেয়েটির। কেউ বলত যোগিনী, কেউ বলত সরস্বতী ঠাকুর, আবার কেউ কেউ ডাকত মাস্টারনী বলে। মেয়েটির ডানদিকের গালের ঠিক মাঝখানে ছিল একটা ছোট্ট কালো রঙ-এর তিল। আমি মেয়েটির নাম দিয়েছিলাম তিলোত্তমা।

খবরটা প্রথম এনেছিল অনন্যা। ওর এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি আশার বাড়ির লোকেদের চেনাশোনা আছে। ওনারা আশাকে ছোট থেকে বড় হতে থেকে দেখেছেন। ছোটবেলার থেকে আশা নাকি খুব হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে। চেহারাতেও একটা লালিত্য ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল আশার জীবনে। জেনেছিলাম আশার বয়স উনিশ। বিয়ে হয়েছিল গ্রামাঞ্চলের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। বরের বয়স ছিল আশার থেকে অনেকটা বেশি। উপায় ছিল না। একে অভাবের সংসার, তারপর দেখতে ভালো না, রং ময়লা, বিয়ে হচ্ছিল না। বাবা আর মা অনেক ধার দেনা, অনেক পণের বিনিময়ে জামাইকে কিনেছিলেন। কিন্তু সুখ আশার কপালে লেখা ছিল না। বিয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আশার বর মারা যায় মোটর সাইকেল একসিডেন্টে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে দোষ দেয় তাদের ছেলের মৃত্যুর জন্য। অপয়া আর রাক্ষুসী বলে তাকে অপবাদ দেয়। অনেক কান্নাকাটি অনেক হাতেপায়ে ধরাধরি করেছিল আশা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন কাজ হল না। অবশেষে একদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে তার বাপের বাড়ি তুলে দিয়ে গেল। অসহায় বাবা মা আর কি করবে, মেয়েকে তো আর ফেলে দিতে পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশাকে তাঁরা আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। জীবনের ওপর বিতৃষ্ণায় আশা একবার আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সময়মত ধরা পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যায়। অবশেষে এক কাকিমার প্রশয়ে আশা ঠিক করে ও পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কাকিমাই সব খরচা বহন করার ব্যবস্থা করেন। সব শোনার পর আশার ওপর আমাদের মন দুঃখ আর সহানুভূতিতে ভরে উঠেছিল। আমার সব বন্ধুরাই কোন না কোন ভাবে আশাকে তার অজান্তে সাহায্য করার চেষ্টা করত। কেন জানিনা আমি আশাকে কোন সাহায্য করিনি, উলটে আমি তার সঙ্গে ভয়ানক এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম কাউকে না জানিয়ে।

আমি আশাকে প্রেমপত্র লিখতে শুরু করলাম। না খামের ভিতরে পোরা, সুন্দর রঙ্গিন কাগজে লেখা স্ট্যাম্প আটকানো চিঠি নয়। খাতার পাতা থেকে ছেঁড়া ছোট চিরকুটে লেখা প্রেমপত্র। আমি শুধু তিনটে কথা লিখতাম চিরকুটে – ‘আমি তোমায় ভালবাসি’। তক্কে তক্কে থাকতাম এবং সুযোগ পেলেই সবার অজান্তে আমার লেখা চিরকুটটা আশার বইয়ের দুটো পাতার মাঝখানে গুঁজে দিতাম। তারপর অনামি এক লেখকের চিরকুটে লেখা ওই তিনটি কথা পড়ে আশার কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আদিঅনন্তকাল ধরে চলে আসা পৃথিবী বিখ্যাত এই তিনটি কথায় ঘায়ল হয়নি এমন মানুষ দুনিয়ায় কোথাও আছে কি না আমার জানা ছিল না। প্রথম চিঠিটা লেখার পর প্রায় তিনদিন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করার পরেও আশার মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। ধরে নিলাম যে তার মানে হয় আশা বইটার ভিতরে রাখা চিরকুটটা দেখার সুযোগ পায়নি অথবা আশা মানুষ নয়। আমিও হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। একদিন সুযোগ বুঝে আবার একটা চিরকুট রেখে দিলাম দুটো পাতার মাঝখানে। প্রফেসর ক্লাসে আসার আগে আমরা ছেলেরা আর মেয়েরা নানারকম হাসি আর ঠাট্টায় মসগুল হয়ে থাকতাম। আর উনি ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথে সব বন্ধ হয়ে যেত। আশা কোনদিন আমাদের এই হাসিঠাট্টায় যোগ দিত না। একটা বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে বসে থাকত। আজ আমি শুধু আশাকে লক্ষ্য করছিলাম। আজ যেন আশাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে। মনের ভুল কিনা জানিনা, একটা পরিবর্তনও আশার মধ্যে মনে হল লক্ষ্য করলাম। সবসময়ে প্রথম সারির বেঞ্চে বসা আশাকে এর আগে কখন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সারিতে বসা ছেলেদের দিকে তাকাতে দেখিনি। আজ দুবার দেখলাম আশা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল। একবার তো প্রায় আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। আমার বুকের ভিতরটা ধক্‌ করে উঠেছিল। ধরা পড়ে গেলাম নাকি? না দেখলাম ঘাড়টা ঘুরিয়ে আশা আবার সামনের দিকে ফিরে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। কোন ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রফেসরকে প্রশ্ন করলে আশা আজকাল মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আশা যেন একটা কিছু খুঁজছে ওর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারতাম।

আমার খেলা চলতে লাগল। আমার চিরকুটে লেখা কথার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল আর সেই সঙ্গে পরিবর্তন হতে সুরু করল আশার ব্যবহারের। আশা আজকাল অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, পিছন ফিরে ছেলেদের দিকে তাকায়। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় না, ঠাট্টা ইয়ার্কিতেও যোগদান করে। আমার কেন যেন মনে হত আশার চোখদুটো সবসময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। আমি যত আশার ব্যবহারের পরিবর্তন দেখতাম ততো মনে মনে খুশি হতাম। একবার একটা পরীক্ষা করার ইচ্ছে হল। চিরকুটে লিখলাম তোমায় হাল্কা নীল রঙ-এর শাড়ী আর খোলা এলোচুলে দেখতে চাই। পরের দিন ক্লাসে ঢুকে আশাকে দেখলাম না। লাস্ট বেঞ্চে বসে আগের দিনের হোমওয়ার্কটা তন্ময় হয়ে চেক্‌ করছিলাম শেষ বারের মত, জমা দেওয়ার আগে। অর্ণবের কনুইয়ের ধাক্কায় চমক ভাঙ্গল। অর্ণব আঙ্গুল দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বলল। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত ব্যাপার। যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ক্লাসের সব ছেলেরা আর মেয়েরা অবাক হয়ে তাদের সামনে দাঁড়ানো আশার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে বলে আশার সারা মুখে একটা লজ্জা মেশানো সুন্দর হাসি। সব থেকে অবাক হলাম আমি। আশার পরনে আজ হাল্কা নীল রঙ্গের শাড়ী আর চুলটা খোলা। কপালে পরেছে একটা বড় টিপ আর ঠোঁটে লাগিয়েছে একটা হাল্কা রং। আশাকে আজ সত্যি সুন্দর লাগছে দেখতে। মেয়েটা এত সুন্দর দেখতে আগে কখনো লক্ষ্য করিনি তো।

ভাগ্যের চক্র কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আমার সুযোগ এলো এক নামকরা কলেজে এঞ্জিনীয়ারিং পড়তে যাওয়ার। একদিন সবাইকার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমার নতুন কলেজ জীবনের জন্য যাত্রা শুরু করলাম। আশার কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম অন্যদের মতই। অল্পদিনের আলাপে আলাদা করে আমাকে মনে রাখার কথা নয় আশার। আমাকে বিদায় জানিয়েছিল অন্যদের মতই। তাতে আন্তরিকতা হয়ত ছিল, ছিল না কোনরকম ঘনিষ্ঠতা। আমি শুধু মনে মনে বলেছিলাম তিলোত্তমা তুমি ভালো থেকো, তোমার ভালো হোক। তারপর অনেক যুগ কেটে গেছে। আমার জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। আমি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেছি। এখানে সাজানো অথচ একটি ছোট্ট নির্জন শহরে আমার বসবাস। এখানে আমার নিজের বলে কেউ নেই। একাকী নিঃসঙ্গতায় আমার জীবন কাটে। প্রায় দুটো যুগ কেটে গেছে দেশ ছেড়ে এসেছি। ফেলে আসা দেশের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। যখন মন খারাপ লাগে তখন মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে স্পঞ্জের মত ভিজিয়ে নিয়ে আসি যতটা পারি দেশের সব কিছুকে নিজের দেহে আর মনে। একবার দেশে যাওয়ার একটা সুযোগ এলো যখন আমন্ত্রণ পেলাম আমার এক নিকট আত্মীয়ের বড় মেয়ের বিয়েতে আসার জন্য। অনেক দিন দেশের কোন বিয়ে বাড়ি আমার যাওয়া হয়নি, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।

দেখলাম বিয়ের ব্যাপারে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে আবার অনেক কিছু একই রকম আছে। আমার ওপর ভার পড়েছিল ছেলের বাড়ির লোকেদের আদর আপ্যায়নের যেন ত্রুটি না হয় তার খোঁজখবর রাখার জন্য। দেখলাম ছেলের বাড়ির লোকজন খুবই ভদ্র, তাঁরা অল্পেই খুশী, তাই আমার কাজ অনেক কম মনে হচ্ছিল। হঠাৎ ছেলের বাড়ির একজন আমাকে দেখে এগিয়ে এল। আমার নাম ধরে ডাকল। আমি চিনতে পারলাম। আমার সেই ছেলেবেলার বন্ধু অর্ণব। দুই বন্ধু ফিরে গেলাম অনেক বছর আগের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। এক ভদ্রমহিলা একসময়ে অর্ণবের কাছে এসে দাঁড়াল। অর্ণব আলাপ করিয়ে দিল। চিনতে পারলাম অনন্যাকে। আমরা তিনজনে মিলে গল্প জুড়ে দিলাম। আমাদের সব বন্ধুদের কথা শুনছিলাম অনন্যার কাছে। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল আশার কথা জানার জন্য। কিন্তু ভিতর থেকে কে যেন আমায় বাধা দিচ্ছিল। হঠাৎ অনন্যাই আশার কথা ওঠাল। জানতে পারলাম যে আশা ডক্‌টোরেট করেছে মাইক্রোবায়োলজীতে। নামকরা বিলিতি কোম্পানিতে উচ্চপদে কাজ করে আশা। বিয়ে করেছে, দুটি সন্তান, একটি ছেলে একটি মেয়ে। খুব সুখের সংসার আশার। তাছাড়া নানারকম সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নিজেকে ব্যস্ত রাখে সে। এত হাসিখুশি আমুদে আর এত পপুলার যে আমি নাকি দেখলে চিনতেই পারব না যে এই আশাই আমাদের সেই আশা।

একটু বাদে ওরা দুজনেই আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে। মনে মনে খুশি হলাম আমার তিলোত্তমা ভাল আছে জেনে। আজ এতদিন বাদে এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় আশাকে লেখা আমার সেই প্রেমপত্রের কথা। সেই চিরকুটে লেখা খেলার কথা। অনেক ছোট ছোট ঘটনা সিনেমার ফ্ল্যাশ্‌ব্যাকের মত ফিরে এল আমার মনের আয়নায়। একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ভিড় করে এল। আচ্ছা, ওই খেলাটা কি আমার ছোটবেলার ছেলেমানুষি ছিল? নাকি আমি কি জেনেশুনে আশার সঙ্গে ওই খেলা খেলেছিলাম? আমি কি আশাকে ভালবাসতাম? নাকি আমার আরো গূঢ় কোন উদ্দেশ্য ছিল?

শকুন্তলা খাঁ ভাদুড়ী

লক্ষ্মী পূজা, সঠিক উচ্চারণে “লক্‌ষ্‌মী পূজা”, বা আমাদের বাঙালীদের সাধের “লোক্‌খি পুজো”। করা বেশ সহজ, নিয়মের কড়াকড়ি কম, আর অনুষ্ঠানের দেখভালের জন্য পুরুতের খুব একটা প্রয়োজন নেই। এই বছর তাই লক্ষ্মী পুজোই ঠিক হল। আমার প্রথম “স্বাধীন” পুজো, বাড়ি থেকে দূরে। আর পতিদেব অনেক দিন ধরেই ছোঁকছোঁক করছিলেন লুচি, বেগুনভাজা, পায়েসের জন্যে, তাই নিজেই বেশ উৎসাহভরে “পুজোর বাজার” করে আনলেন মায়ামি-র উত্তর থেকে, পঞ্চাশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে।
ইতস্ততঃ এক পা, দুই পা করে পরিকল্পনা এগিয়ে চলল বাস্তবায়নের দিকে। কিভাবে শুরু করব? কি কি লাগবে? ধর্মেকর্মে আমার খুব একটা মতি কোনদিনই ছিলনা, তাই শশব্যস্তে ফোন করলাম মা আর মামী কে, তাঁরা তো আহ্লাদে আটখানা। কথোপকথন চলল –
“এই তো, কিছু না, খুঊব সোজা। এইটা এইটা লাগবে…” (এক ডজন জিনিসপত্রের ফর্দ, আর তার সঙ্গে না পাওয়া গেলে বিকল্প ব্যবস্থার পরামর্শ)
“পঞ্চশস্য আছে? না না, পাঁচফোড়ন দিয়ে হবে না, শুধু চাল দিয়ে দিস। ডাব না পেলে যে কোন গোটা ফল ঘটে বসিয়ে দিস।”
“লাল গামছা নেই? একটা রুমাল দিয়ে ঘট ঢেকে দিবি… নতুন রুমাল আছে তো? পেপার ন্যাপকিন হলে… নাঃ, পেপার ন্যাপকিন-এ হবে না।”
“বেলপাতা-তুলসীপাতা পাওয়া যাচ্ছে না? মা লক্ষ্মী তো সবই জানেন, বলে দিস এখানে ওসব পাওয়া যায় না… না, রান্নার মশলা শুকনো তুলসীপাতা দেবার দরকার নেই।”
প্রবাসে নিয়মো নাস্তি।
ফর্দ লিখে নিয়ে শুরু হল কাছে দূরে যাবতীয় ইন্ডিয়ান গ্রোসারী স্টোর-এর তত্ত্বতল্লাস। চন্দন – লাল আর সাদা – পাওয়া গেল। ছোট বোতলে গঙ্গাজল – তাও পাওয়া গেল। (“ওটা হরিদ্বার-ব্র্যান্ডের কলের জল” – পতিদেবের ফোড়ন) তামার ঘট, প্রদীপ, সলতে, নতুন কাপড়, নারকোল (“ছোলার ডাল হবে বুঝি?”), পান, সুপুরী, কর্পূর – পাওয়া গেল। পাঁচ রকমের ফল, পাঁচ রকমের তরকারী, ময়দা, সুজি, মিষ্টি – সবই মিলে গেল। জিঙ্ক অক্সাইড পেলাম না। তাহলে আলপনার জন্য পোস্টার কালার-ই সই।
আবার মা-কে ফোন, এবার জিজ্ঞাস্য পুজোর প্রণালী আর ভোগ-নৈবেদ্যর খুঁটিনাটি। কিঞ্চিত অদ্ভুত আলোচনা হল এইরকম –
মা – পঞ্চপ্রদীপ, কর্পূর, ধূপ, জলশঙ্খ, ফুল, পাখা এই সব দিয়ে আরতি করবি।
আমি – জলশঙ্খ নেই। পাখা নেই। এমনি শাঁখে একটু জল দিয়ে আরতি করে দেব, আর কাগজ দিয়ে পাখা বানিয়ে দেব, হ্যাঁ?
মা – ঠিক আছে। পাঁচালী আছে তো?
আমি – চিঙ্কি বলেছে আইপ্যাড-এ ডাউনলোড করে দেবে।
মা – ঠিক আছে, নিবেদন করে নিস।
আমি – আইপ্যাড-টা নিবেদন করে দেব?
মা – না না, ওই ভোগ ফল প্রসাদ এই সবে একটু গঙ্গাজল ছিটিয়ে নিবেদন করে দিস।
আমি – আচ্ছা, ঘটে কি যেন একটা আঁকতে হয়?
মা – হ্যাঁ, কাঠি কাঠি হাত পা-ওলা মানুষ – প্রথমে একটা প্লাস আঁক, তারপর ওপরে একটা গোলমত মুখ, হাত পা গুলো এক্সটেন্ড করে ল্যাটারালি…
আমি – ল্যাটারাল আবার কি? বাইরের দিকে করব তো?
মা – ল্যাটারাল মিডিয়াল বুঝিস না? মিডিয়াল মানে শরীরের মধ্যাংশের দিকে, ল্যাটারাল মানে…
আমি – না ওসব ডাক্তারী ব্যাপার – পুজোর মধ্যে ল্যাটারাল-মিডিয়াল হিজিবিজি… ধুত্তেরি। হাত পা গুলো টেনে টেনে বাইরের দিকে বার করে দেব, এই তো?
মা – হ্যাঁ, আর প্রোপোর্শন-গুলো ঠিক রাখিস, মানে গলা পেট হাত পা…
আমি – ওফফ মা! আচ্ছা আমি রাখছি এখন।
পুজোর দিন সকাল। ঘটের জন্য মালা, যাতে শুকিয়ে না যায় তাই গেঁথে গুছিয়ে ফ্রীজ-এ রাখা। নৈবেদ্যর জন্যে গোবিন্দভোগ চাল ভিজনো। পায়েস তৈরী। ভোগ-এর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা চিঙ্কি রাঁধবে বলে, সে সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছোচ্ছে। মনে মনে একটু গজগজ করলাম নাড়ু, মুড়কি আর দই-এর অভাবের জন্য। এইসব উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে আপিস-কাছারী, মিটিং ইত্যাদি জাগতিক ব্যাপারস্যাপারও আছে, নজর দেবার জন্য। কিন্তু কাজ মোটামুটি সাবাড় হয়ে গেল দুপুরের মধ্যে – খুব সম্ভবত দৈবী হস্তক্ষেপে। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে।
দুপুরবেলা। বাড়ির আশেপাশে চক্কর কাটতে গেলাম, যদি একটা সার্বজনীন আমগাছ পাওয়া যায়। এখানে প্রায় প্রত্যেক বাড়ির সামনের জমিতেই বিভিন্ন আমগাছ আছে, কিন্তু আমি খুঁজছি এমন একটা (১) যার কয়েকটা ডালপালা আছে হাতের কাছে (২) যেটা একটু লোকচক্ষুর অন্তরালে। Et voilà! বাড়ি ফিরলাম মহার্ঘ সপ্তপর্ণী আমের ডাল নিয়ে; কিছু কলাপাতা, জুঁই আর জবাও পাওয়া গেল আশপাশের অচেনা প্রতিবেশীর বাগানে। বেশ একটা বারোয়ারি-বারোয়ারি ব্যাপার – আমি প্রসন্নচিত্তে বাড়ি পৌঁছালাম।
সন্ধ্যেবেলা। বসবার ঘরের আসবাব পত্র ঠেলে ঠুলে পুজোর জায়গা হলো। ছোট্ট রুপোর “লক্ষ্মী ঠাকুর”-এর মূর্তি তেপায়া টেবিল-এর ওপরে সাজানো, জবা আর জুই দিয়ে। সামনে প্রদীপ আর ধুপকাঠি জ্বালানোর জন্য তৈরী। ছোট্ট ছোট্ট কলাপাতার টুকরোর ওপরে সমস্ত উপচার – পঞ্চপ্রদীপ, শাঁখ, চন্দন, সিঁদুর, একটা ছোট লালপাথরের বোতলে গঙ্গাজল, কর্পূর, আর ঘট। পোস্টার কালার দিয়ে একটু আলপনা দেবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু খুব একটা দাঁড়াল না দেখে নতুন জোগাড় করা হামানদিস্তায় একটু চাল বাটলাম, অল্প জল দিয়ে লেই বানিয়ে তাই দিয়ে আবার আলপনা আঁকা হল – এবার অনেক সুন্দর হল। নিজেই বাঃ বলে নিলাম একটু।
পতিদেব চিঙ্কি-কে নিয়ে এলেন এয়ারপোর্ট থেকে। বসার ঘরের আমূল পরিবর্তন আর একটা “পুজো পুজো গন্ধ” – তাতে আমি চমৎকৃত, বেশ গদগদ হয়ে পড়লাম। রান্না, কাটাকুটি, ভাজাভুজি শেষে চিঙ্কি আর আমি শাড়ি পড়ে নিলাম, পুজো শুরু হল রাত্রি এগারোটা নাগাদ। বার্মুডার ওপরে একটা পাঞ্জাবী চাপিয়ে আর ভোগের থালায় হাত মেরে পতিদেব আয়োজনে যোগদান করলেন। “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি”র কথা স্বাভাবিক ভাবেই মনে পড়ে যাচ্ছিল।
পূর্ণিমা। আসনে বসে আমাদের বাড়ির আসল পুরুত ঠাকরুণ – মামী – কে অনুকরণ করার চেষ্টা করছি; সমস্ত নৈবেদ্যতে গঙ্গাজল ছিটিয়ে যা যা মন্ত্র মনে ছিল পড়ে গেলাম একধারে, দুর্গা, শিব, নারায়ণ, কালী, চন্ডী, সরস্বতী আর অবশ্যই, লক্ষ্মী – সবাইকেই ডেকে ফেললাম। ভাবলাম সবাই যখন সেই একই সুখী পরিবারের সদস্য, তখন মা লক্ষ্মী নিশ্চয় কিছু মনে করবেন না অন্যান্য দেব-দেবীর সঙ্গে তাঁর পুজো ভাগ করে নিতে। এর পরে তাম্রনির্মিত ঘটের গায়ে সুন্দর কাঠি-চিত্র, ওপরে আমপাতা, নারকোল আর লাল কাপড়, তাতে চাপান প্রায়-জমে বরফ মালা। এবার আইপ্যাড-মারফত পাঁচালী পঠন, আশাতিরিক্ত সুষ্ঠভাবেই হয়ে গেল। সবশেষে বিনা-পাখাতেই আরতি, পুষ্পাঞ্জলি – ব্যাস্‌, পুজো শেষ।
মাথাটা অদ্ভুতরকম হাল্কা লাগছিল, মনে পড়ল সারাদিন দাঁতে কিছু কাটা হয়নি। সেরকমই হওয়া উচিত অবশ্য।
এবার খাওয়ার পালা, তার সঙ্গে প্রসাদ আর ভোগ সেবন। চাঁদ ততক্ষণে আদ্ধেক আকাশ পার করে ফেলেছে। প্রারব্ধ কর্মের সুচারু সমাধানে যুগপৎ উল্লসিত এবং অবসন্ন আমরা এবার শয্যাভিমুখে, যদিও তার আগে চকিতে ফেস্‌বুক-এ ছবি আপলোড হয়ে গেল, আর মা-কে ফোন-এ রিপোর্ট করে দিলাম আমার প্রথম পুজোর সাফল্যের বার্তা।
বহুপরে, এক নিঃশব্দ চিন্তনের মূহুর্তে, একটা চিন্তা – যেটা দানা বাঁধছিল অনেকক্ষণ ধরে – আত্মপ্রকাশ করল স্বমূর্তিতে। বুঝতে পারলাম, আমি এই পুজোটা ধর্মীয় আতিশয্যে করিনি, অথবা মা লক্ষ্মীর কৃপালাভের আর্তচিন্তায়ও নয়। (ঘটনা হল, কোন অনির্দিষ্ট কারণে আমি বরাবরই মা সরস্বতীকে অনেক বেশী কাছের বলে মনে করেছি।)
তো কেন করলাম? এক্কেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ এবং স্বার্থের কারণে – আমার ছোট মায়ামি-র বাড়িকে ওই পি৫৪৪, রাজা বসন্ত রায় রোড-এর একটা অংশে পরিণত করতে। ছোটবেলার স্মৃতিগুলোর সঙ্গে আবার সংযোগস্থাপন করতে, চন্দনকাঠ, ধুপ আর হোম-এর আগুনের চিরপরিচিত রূপকে ফিরে পেতে। মন্ত্রপাঠের অচঞ্চল স্বর, শঙ্খধ্বনির সুরেলা আওয়াজ; তেলের প্রদীপের স্তিমিত আলো; সবুজ পাতার ওপরে রঙীন ফুলের অসাধারণ নকশা; ঘি-কর্পূর-চন্দন-অগুরুর সুবাস। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একাত্মবোধের বাসনাপূরণ। এবং আবার করে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার অবর্ণনীয় অনুভূতি।
এবং আমাদের “তিনতলার ঠাকুরঘর” সাতসমুদ্র পার করে এসে তার আলিঙ্গনে আমাদের ঘিরে ধরল। পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং।
আমরা সেই আশীর্বাদধন্য।

শাশ্বতী ভট্টাচার্য

 

গ্রীষ্মকালের শেষ, আমেরিকার মধ্য-উত্তরাঞ্চলের ছোট শহর রিভারফলস্‌ এ শনিবারের সকাল। শান্ত নির্জন, সুন্দর। আর হবে নাই বা কেন? এই শহরে একটা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আছেটাই বা কি?

চায়ের ধূমায়িত কাপটা নিয়ে বাইরের ছোট বারান্দাটা গিয়ে বসি। বাবা আর ছেলে দুইজনেই ঘুমোচ্ছে, আমারই পোড়া চোখে ঘুম নেই!

দেখতে দেখতে বছরগুলো চলে গেল! কোলের ছেলেটা স্কুল পাশ করে, বিজনেস ম্যানেজমেন্টে আন্ডার-গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী করার জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছর বাড়ির বাইরে থাকলো, এখন আবার প্রোডাকশন ম্যানেজারের চাকরী নিয়ে দূরে সেই কোন পশ্চিম বেলাভূমিতে চলে যাবে, সেই বিরতির মাঝের একটা সপ্তাহ বাপ-মায়ের কাছে এসেছে, বাড়িতে থাকবে। ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেবে ছুটিটা…

তাও ভালো, ওর বয়সী ছেলেরা বাড়ীতে এসেই কফির আড্ডায় চলে যায়, ঋক ঘরে ঢুকেই আমার রান্নাঘরের বাগান দেখতে চেয়েছে, সেখানে টমেটো, বেগুন, জুকিনি বেল পেপারের সমাহারে অভিভূত হয়েছে, প্রশংসা করেছে। খাবার ঘরে ঘুরে ঘুরে গল্প করেছে, ‘মা তুমি কি চুলে নতুন ছাঁট দিয়েছো? ভালো হয়েছে, ইয়াং দেখাচ্ছে।’ ওর বাপের তো এই সব দিকে কোন খেয়ালই নেই!

ঋকের শিশু মুখটা মনে পড়ে, আমি ছেলে চেয়েছিলাম, অভিরূপ চেয়েছিল মেয়ে। ঋক ছোটবেলাতেই কি সেটা জানতে পেরে গিয়েছিল? পাঁচবছর বয়স থেকেই আমার সাথে ঘুরে ঘুরে বাজার দোকান করতে আর একটু বড়ো হয়ে বাপের সাথে কম্প্যুটারে ভিডিও খেলা দুদিকেই সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছে ছেলেটা। নাঃ, মেয়ে না হওয়ার কোন দুঃখই আমার নেই।

কলেজে পড়াকালীন বাড়িতে এলে আমাদের মায়ে-পোয়েতে এই সকাল বেলার গল্পটা জমতো ভালো, আজকে ওকে ডাকতে গিয়েও থমকে গেছি – ‘মা, বড়ো কাজ নিচ্ছি, অনেক কাজের চাপ থাকবে, আবার যে কবে আসবো জানিনা, একটু বেশি বেলা অব্দি ঘুমোবো, কিছু মনে করো না যেন।’

ছেলেটা সেই ছোটবেলা থেকেই সংযত আত্মসংবৃত। কিন্তু সময় চলে যাচ্ছে যে, কবে সেই একটুকরো বাচ্চাটা সংসার অরণ্যে নতুন একটা গাছ হবে? ফুলে ফলে ভরে উঠবে? ওর টুকটুকে লাল শাড়ি পরা বউ কি আমাকে ‘মা’, ‘মাম্মি’, ‘মিসেস স্যানিয়াল’, নাকি স্রেফ ‘সুগতা’ বলেই ডাকবে? কোথা থেকে জমা একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে, একটা দীঘল চোখের কুসুম-কোমল বউকে ওর সঙ্গে জুড়ে দিতে পারতাম যদি! সেই একা-একা থাকবে?

প্রেম? নাঃ, আমার ছেলে পথ এখনও সেই পথ মাড়ায় নি। পড়াশোনা, সাঁতার, দাবা, ম্যাথ-অলিম্পিয়াড, আবৃত্তির মাঝখানে ওর স্কুলের, কলেজের বান্ধবীদের সাথে আলাপ হয়েছে, ঋকের সাথে ওদের ভাব কোনদিন নিছক বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় নি। হঠাৎ হাসি পেয়ে যায়, হ্যালোউইনের দিনে ওর মেয়ে-বন্ধুদের সাথে রাজকন্যে সেজে সেই আটবছরের ছেলেটার সে কি আনন্দ! ওর কলেজ জীবনেও দেখেছি, ওর বয়সী অন্য ছেলেরা যখন ‘মাচো’ প্রতিযোগিতায় কে কত পুরুষালী সেই প্রর্দশনীতে ব্যস্ত, আমার ছেলে শান্ত, ধীর, সমাহিত। ঋকের আগুনে জ্বালা নেই, ওর মেয়েবন্ধুরা ওর সান্নিধ্যের উত্তাপে স্নিগ্ধতা আহরণ করে! দু-একটা ছেলেকেও বাড়িতে নিয়ে এসেছে ঋক, ওরাও যেন ঋকেরই মতো! নরম, দেখলে মমতার উদ্রেক হয়।

হাতে চায়ের কাপটা ঠাণ্ডা… শেষ চুমুক দিই। তবে কি কলকাতা থেকে অর্ডার দিয়ে বউ আনতে হবে আমায়?
এটা কি একটা নালিশ? হাসি পেয়ে যায়, ছিঃ। ওর বয়সী অন্য ছেলেরা একের পর এক মেয়ে বন্ধু পরখ করছে, আমার ছেলে ‘মিস রাইট’ এর অপেক্ষায় আছে। হ্যাঁ, ঋক ওর বাপের মতো। আমিই তো অভিরূপের জীবনে প্রথম মেয়ে।
তবে? এটা মেনে নিতে অসুবিধে কোথায়? হ্যাঁ?

ফোনটা ঝনঝন করে বেজে ওঠে। পৃথা।
‘সাত সকালে কি মনে করে ভাই?’
‘বড়ো মুশকিলে পড়েছি, একটা উপকার দরকার।’ পৃথার সোজাসাপটা কথা। ‘অর্ক স্কুল পাশ করে কলেজে যাচ্ছে, ইউনিভার্সিটির ডর্মে থাকতে চায়, ওর মেয়ে বন্ধুটিও এই এক জায়গায়, বাবা-মায়ের হোটেলের সুবিধতে ছেলের অভ্যেস হয়ে গেছে, এখন আমায় একগাদা জিনিস বয়ে মরতে হবে!’
‘আহা চটছো কেন? কলেজে পড়তে যাওয়া মানে আরো একটু স্বাধীনতা, বোঝো না?’ ইউনিভার্সিটির ডর্মিটরি, প্রকারান্তরে দেশলাই বাক্সের ছোট ছোট খুপরি সমৃদ্ধ বহুতল বাড়ি। কিন্তু যখন-তখন ক্লাসের জন্য আদর্শ।
‘তোমার ভ্যানটা দরকার… আসতে পারবে এখনই?’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, আমার ভ্যান বলো কেন, ওটা তোমার-আমার-সবাকার, এই ছোট্ট জীবনে আমার-তোমার কোরো নাকো বন্ধু, এখনই আসছি।’ আমি চটপট জবাব দিই।
পৃথার বাড়ি আমার বাড়ি থেকে প্রায় দেড় ঘন্টার পথ।
‘পিছনের দরজা নিয়ে জিনিসপত্র তুলতে হবে, সেই বুঝে গাড়ি পার্ক কোরো, সুবিধে হবে,’ ফোন রাখার আওয়াজ পাই।

‘কিগো? সাতসকালে কার ফোন?’ চোখ কচলাতে কচলাতে অভিরূপ দেখা দেয়।

সম্প্রতি চোখে চশমা নিয়েছি, তার মধ্যে দিয়ে ওকে দেখি। ঘুম থেকে উঠে এসেছে, এক হাতে গত রাত্রের জলের গেলাস, অন্য হাতে ভাঁজকরা স্লিপিং গাউন, এলোমেলো কাঁচা-পাকা-চুল। কপালের সামনে মাথাটা বেশ ফাঁকা হয়ে এসেছে, মেরেকেটে আর এক-আধটা দশেক! তারপরেই আমার শ্বশুরের প্রশস্ত কপাল দেখা দেবে!

মমতা জড়িয়ে বলি, ‘যাঃ, তোমার কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো তো! পৃথা ফোন করেছে।’
জীবনের পঁচিশটা বছর আমার সাথে কাটিয়ে অভিরূপ এখন আফশোস করে, ওর নাকি সারা জীবনটাই ভোগান্তি আর ব্যর্থতা। ‘তোমার সাথে দুনিয়ার লোকের পরিচয়! তা হঠাৎ এতো সকালে?’
রাগ হয়, কণ্ঠস্বরে সমপরিমান উষ্মা আর অনুকম্পা মিশিয়ে বলি, ‘এমন কিছু সকাল নয় তো! প্রায় আটটা বাজে! বেচারী মুশকিলে পড়েছে….’
অভিরূপ মাথা চুলকায়, আহত স্বরে বলে ‘কাল বড্ড দেরী হলোনা ঘুমোতে?’
আমার যেন আর বয়স হয় নি! সারাজীবনই একটা ধেড়ে ছেলের ‘মা-গিরি’ করে গেলাম।
দাঁত খিচিয়ে বলি, ‘দেখো অসুবিধায় পড়েছে, ওর ছেলের জন্য বড়ো ভ্যানটা চাই, বাড়ি থেকে ডর্মে যেতে হবে, আমি বেরোলাম।’ চাবির গোছা আর সেল ফোনটা ব্যাগের ভিতরে রাখি।
‘তুমি একা সামলাতে পারবে? মাল টানাটানির ব্যপার আছে! দাঁড়াও, অপেক্ষা করো, আমিও বেরোচ্ছি।’ দাঁত খিঁচানিতে অভিরূপও কম যায় না। নারী পৃথিবীর বোঝা বইবে, তাও আবার হয় নাকি? সক্ষমতার ক্ষেত্রে অভিরূপ পুং-শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী।
‘চলো, বলছো যখন… ঋক তো ঘুমোচ্ছে, ও ওঠার আগেই আমরা ফেরত চলে আসবো।’ আমি নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিই, অভিরূপ আসবে বলে যে স্বস্তি পেলাম সেটা ওকে না জানালেও চলবে।
‘ঠিক আছে, আমি দুই মিনিটের মধ্যে কফিটা নিয়ে আসি, তুমি গুছিয়ে নাও,’ গ্যারাজ খোলার আওয়াজ পাই।

শনিবার, উইকেন্ড বলে কথা। বাড়ির ইন্সট্যান্ট নেস্‌কফিতে অভিরূপের নেশা মেটে না, তাই বাড়ি থেকে একমাইল দূরের দোকান ‘স্টারবাক্‌স’ থেকে মোকা-লাটে ওরফে গ্যারগেরে মিষ্টি মেশানো কফি কেনার জন্য অভিরূপকে সময় দিতেই হয়। পরিমাণমতো ক্যাফিন এবং চিনির ডোজ না পড়লে কোনো ভদ্রলোকেরই ঘুম ভাঙে না, এটা কে না জানে?

ও যতক্ষণ না ফেরে, গাড়িতে বাজানোর জন্য কয়েকটা গানের ক্যাসেট বেছে রাখি, ঋকের জন্য জল-খাবার টেবিলের ওপর সাজাই, চার জোড়া গ্লাভস, জিনিসপত্র বাঁধার জন্য মোটা দড়ি, মাল বইবার ট্রলি, ওয়াটার-কুলারে জল, গ্যারাজের সামনে গুছিয়ে রেখে বাইরে বসে ওর জন্যে অপেক্ষা করি। আধঘন্টা পরে বাবুর উদয় হয়।
‘কি করছো? তাড়াতাড়ি করো, উঠে এসো গাড়িতে’, জানলা থেকে মুখ গলিয়ে অভিরূপ আমাকে ডাকে।
নিজে আধঘন্টা বাদে এসে এখন আমাকে তাড়াতাড়ি করতে বলল? ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাত-ঘড়িতে সময় দেখি। আমি পুরোনো-পন্থী, এখনও হাতে ঘড়ি পরি বলে আমায় অনেক কথা শুনতে হয়! ‘পৃথাকে বলেছিলাম এখনি বেরোচ্ছি, একটু দেরি হয়ে যাচ্ছে মনে হয়।’ যেন জোরে জোরে কথার মাধ্যমে ভাবছি।
‘এতো ব্যস্ত হয়ো না তো? যেমন একটা বিদঘুটে ঘড়ি! পরেছো বলেই ঘন ঘন দেখতে হবে? হুট করে বেরোলেই হলো? সব নিয়ে গুছিয়ে-গাছিয়ে বেরোতে হবে তো!’ জানি কথা বাড়ালেই বাড়বে, একটা গান চালাই, সিটে মাথাটা এলিয়ে দিই।

আজ বাড়ি ফিরে ঋকের সাথে একটা ফয়সালা করতেই হবে, ওর যদি মনে মনে কারোকে ভালো লেগে থাকে আমাদের বলুক, তা না হলে কলকাতায় খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে মেয়ে খুঁজবো।

আমাদের বিয়েটাও তো ওই রকম করেই হয়েছিল। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপি, কোথায় গেল সেই সব দিনগুলো? আমাদের দুজনের সম্পর্ক এখন শুধু থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়।

‘কি গো ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’ অভীরপের কথায় চমক ভাঙে, ‘কাল চেক আর্কিওলজি থেকে উঠে আসা একটা খবর দেখে বড্ড বিরক্ত লেগেছে, রাতে ঘুম আসছিল না! সত্যি বিজ্ঞানীরদের যেন খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই। এইসব করে এই প্রজন্মের ছেলেপিলেদের মাথা খারাপ করছে’।
‘ওই ‘সম…দের’ নিয়ে তো.?’ এমনকি অভিরূপের কাছেও পুরো শব্দটা বলতে আমার বাধো বাধো ঠেকে। কিছু সংস্কার রক্তের মধ্যে মিশে গেছে। ‘যা বলেছো!’
যাক, তবু এতক্ষণে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর আলোচনা করার মতো একটা বিষয়বস্তু পাওয়া গেছে! ‘আমিও পড়েছি খবরটা।’ কিছুদিন আগে খবরে বেরিয়েছিল। মাটি খুড়ে চেক আর্কিয়োলজিস্টরা একটা মমি পেয়েছেন। সম্ভবতঃ খ্রীষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগেকার মমি। মজার জিনিস হলো, মমিটি একটি প্রকৃতিগত ভাবে ছেলের হওয়া সত্ত্বেও তাকে কবরে শোয়ানো রয়েছে এমন কায়দায় যা দেখে মনে মতে পারে ওটি একটি মেয়ের। তাই থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করে নিয়েছেন, এই মমি-রূপ ছেলেটি একটু ‘বেশি মাত্রার মেয়েলি’ ছিলেন! কি যন্ত্রণা! ‘কিছু না, এই যুগের কিছু ছেলের ‘অস্বাভাবিকতা’কে ‘ন্যাচারাল’ দেখানোর চেষ্টা।’ কয়েক হাজার বছর আগেকার একটা পুরুষ মমিকে সমকামী বলে নির্দিষ্ট করে নিতে পারলেই এখনকার কয়েকটা এঁচোড়ে পাকা ছেলেপুলের অস্বাভাবিকতাকে মেনে নেওয়া যাবে? এই সব বাজে জিনিষে আমরা স্বামী-স্ত্রী বিশ্বাস করি না।
কফির কাজ শুরু হয়েছে, অভিরূপ উত্তেজিত স্বরে আমায় সর্মথন করে, ‘প্রমাণ হয়ে গেল পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর আগেও ওইসব, কি বলে যেন? নপুংসক গে-লেসবিয়ান ছিল? কি? না, মমিটি বামদিক ফিরে শুয়ে, আর তার মুখ পশ্চিম দিকে তাকিয়ে, তাতেই এতো বড়ো একটা জিনিষ প্রমাণ হয়ে গেল?’
‘আহ! সকাল বেলায়, হাইওয়ে এর ওপরে, অত জোরে জোরে অমঙ্গুলে শব্দগুলো না বললেও চলবে।’ আমি অভিরূপের শব্দনির্বাচনের প্রতিবাদ করি, ‘না, কিচ্ছু প্রমাণ হলো না! মানুষ মাত্রেই ভুল হয়, ওই অত হাজার বছর আগে এই সব ছিলোই না, যত রাজ্যের আজগুবি!’ সারা জীবনের শিক্ষা তো একদল বৈজ্ঞানিকের মনগড়া একটা চিন্তায় নস্যাৎ দেওয়া যায় না! ভাগ্যিস আমরা এই রকম, ‘স্বাভাবিক’ ‘ঠিক-ঠিক’। একটা হাত বাড়িয়ে অভিরূপের একটা হাত নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করি।
‘কি হলো কি তোমার? কফিটা আরেকটু হলে পড়তো!’ অভিরূপ বিরক্ত গলায় বলে।
‘ভুল হয়ে গেছে গো, দুঃখিত।’ আমি সরে বসি।
‘ভুলে যেও না সুগতা, নিজেদের মধ্যে হাসাহসি, খুনসুটি, বিনা কারণে পরস্পরকে ছোঁয়ার দিন চলে গেছে আমাদের।’
ছেলে বড়ো হয়েছে।

দূর থেকে দেখতে পাই, পৃথার বাড়ির সামনে একটা ছোটখাটো সংসার। মোরাম বিছানো রাস্তায় মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকে শুরু করে জুতো রাখার তাক। দুটো সুটকেস, তিনটে প্যাকিং বক্স, মায় একটা ছোট রেফ্রিজারেটারও রাস্তা আলো করে তৈরী হয়ে আছে। হোষ্টেলের ঘরে অর্কর যাতে কোন অসুবিধে যাতে না হয় ওর মায়ের সেই চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই।

গাড়ি থেকে নেমে পড়ে এদিক-ওদিক তাকাতেই অর্ককে আবিষ্কার করি। গাছের আড়ালে কানে একটা ছোট হেডফোন গুঁজে একটা বিরাট প্যাকিংবাক্সের ওপর বসে গানের তালে তালে পা ঠুকছে। হাতের ফোনে সম্ভবতঃ বান্ধবীর সাথে কথাবার্তা চালাচ্ছে। পৃথা আমাদের শব্দ পেয়ে বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ায়। ওর থমথমে মুখ আর গজগজ থেকে অনেক কিছু আন্দাজ করে নিতে পারি। ‘এই তোমাদের আসার সময় হলো? কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, আর একজনের তো বাড়িতে তো কোন কাজ নেই! ছাই ফেলার ভাঙা কুলো আমি যখন আছি। আমাদের নিজেদের ভ্যানটা আমাদের তো কাজে লাগে না!’

‘কি হল কি! তোমার সুপারস্টার বর কি করলো আবার?’ পৃথার বর সাগ্নিককে একে মারাদোনার মতো দেখতে, তার ওপর ভালো ফুটবলে খেলে। শহরে হাই-স্কুল-পড়ুয়া ছেলেদের ফুটবল কোচ; বিনা পয়সার স্বেচ্ছাসেবক। প্রতি শনি-রবিবার সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত খেলা শেখায়, ছেলেদের হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করে, মাঝে মাঝে আবার সিনেমা, একজিবিশনেও নিয়ে যায়। আমাদের বাঙালি মহিলা-মহলে দু-একজন প্রকাশ্যেই পৃথার স্বামীভাগ্যে ঈর্ষান্বিত বোধ করে।
‘আমার কর্তাটিও দেখো না! ওর জন্যই তো দেরী হলো, সাগ্নিক তবু তো….’
পৃথার কণ্ঠস্বর এবার উঁচু পর্দায়, ‘তোমাকে আর ওকালতি করতে হবে না!’ তারপর অভিরূপের দিকে ফিরে তাকায় ‘আজকেই একটা ফাইনাল-গেম আছে, টিমের সাতটা ছেলেকে রাইড দিতে হয়েছে, কোচ না থাকলে দল গো-হারা হারবে, পৃথিবী রসাতলে চলে যাবে। জানো না?’
‘আ…রে, ঠিক আছে… চিন্তা কী? পড়শি আমি…আমরা সব আছি তাহলে কি করতে? এই বিদেশ বিভুঁইতে? হ্যাঁ?’ অভিরূপ ওর বিখ্যাত অমায়িক হাসি হাসে, অভয় প্রদানের মুদ্রায় ওর হাত ওপরে তোলা। ওকে হাসলে এখনও কি সুন্দর দেখায়, অথচ ঘরে বাইরে আমরা দুইজনে এখন শুধুই দুই পরস্পর বিরোধী দল।
‘সাগ্নিক একটা দারুণ ভালো কাজ করছে পৃথা,’ আমি পৃথার মনে রোমাঞ্চ জাগানোর চেষ্টা করি, ‘দেখো গিয়ে, কতো লোক সপ্তাহান্তে এখনও পড়ে পড়ে ঘুমোয়, আলসেমি করে এখানে ওখানে কফি কিনতে বেরোয় এই শনিবার সকালে…’ ‘তুমি থামো। একসাথে সংসার করতে হলে বুঝতে, আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেল।’ পৃথা এই নিয়ে কোন আলোচনা চায় না।

চারতলা বিল্ডিংয়ের সামনের চত্তরটা গিজগিজ করছে মানুষ। নানা আকৃতি, নানা প্রকৃতির মানুষ।

বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন রঙের, জীবনের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে উঠে আসা নারী-পুরুষ। একেবারে মেলা বসে গেছে।

‘বাপরে! দেখেছো কান্ড!’ আমি অভিরূপকে ঠেলা দিই, ‘এ যে একেবারে চাঁদের হাট বসিয়ে দিয়েছে!’
‘যত দিন বাড়ছে, লোক বাড়ছে… হবে না? আমাদের ছেলে ছোট্ট শহরের কলেজে গেছে তাই জানো না, এমনিই হয়।’ অভিরূপের সহজ উত্তর, আমার কথাকে ও সচারাচর পাত্তা দেয় না।
‘গঙ্গাস্নানের মেলাও বলতে পারো, বিদ্যার্জনের ভিড়,’ পৃথা আমার কথায় সায় দেয়।

ছোট্ট এলিভেটরে চার-পাঁচ জনের বেশি ধরে না, তারই মধ্যে একটা ছোট প্যাকিং বাক্স, টিফানী ব্র্যাণ্ডের কায়দার ছোট্ট টেবিল ল্যাম্প নিয়ে কোনরকমে ঘেঁষাঘেঁষি করে আমি একটু জায়গা করে নিই। অর্ক আর পৃথাকে ভিড়ের মধ্যে দেখি, কিন্তু ততক্ষণে এলিভেটর উঠতে শুরু করে দিয়েছে।
অর্কর ঘর চারতলায়। ডানদিকের দেওয়ালের একেবারে শেষে। অসুবিধে হবে না।
এলিভেটর থেকে বেরিয়ে দু’ধারে লম্বা করিডর। করিডরের দুই পাশে ঘর, এক একটা ঘরে দুই জনের থাকার ব্যবস্থা। ঘরের গায়ে দুটো করে নাম টাঙানো।
এইখানেও ভিড়, জিনিষপত্রগুলো সাবধানে বার করে নিয়ে অর্কর ঘরের দিকে যেতে শুরু করি। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারি না।

ছোট্ট করিডোরের মুখে দাঁড়িয়ে ঘরোয়া আলোচনায় ব্যস্ত ওয়াকার দম্পত্তি। ট্যাক্স উপদেষ্টা ষাটোর্দ্ধ মিঃ জশুয়া ওয়াকার আঠেরো বছরের হোটেল-নাচিয়ে মরিয়মকে বিয়ে করে এই ছোট্ট শহরে সাড়া ফেলেছিলেন। তখন ওনার আগের পক্ষের ছেলে বিলের বয়স চোদ্দ। বড়োলোক পাড়ায়, বিরাট বাড়িতে থাকেন। ক্রিসমাসের সময় ওনার বাড়ির সামনে প্রদর্শনী দেখার জন্য অন্য শহর থেকে লোক আসে। স্বামী-স্ত্রী দুজনের বাম হাতের অনামিকায় চোখে পরার মতো বড়ো হীরের আংটি। গলায় সোনার চেনে, রত্নখচিত ক্রুশে বিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের ছবি ঝোলানো।

বড়োলোকের ছেলে বিল, দামী প্রাইভেট কলেজে না গিয়ে এখানে কি করছে? আমার মনে হলো, আমাকে দেখতে পেয়েই যেন ডর্মের দেওয়ালে আর্টেমিসিয়ার ছবি ‘ম্যাডোনা আর শিশু’ না কি সালভাদর ডালির ‘দ্য ব্যাসকেট অফ ব্রেড’ সেই মধুর বির্তকের উৎসাহটা একটু বেড়ে গেল।

‘দুটোই থাকুক, কি এমন দাম? দশ বারো গ্রান্ড বই তো নয়?’
‘না না পাগল? কি যে বলো!’ মারীয়ম হাতের ছোট্ট পশমের ব্যাগ দিয়ে স্বামীর পিঠে মারেন।
‘আপনাদের আলোচনায় একটু ব্যাঘাৎ ঘটানোর জন্য দুঃখিত, কিন্তু একটু পাশ পাওয়া যাবে কি?’ আমি প্রশ্ন করি।
‘নিশ্চয়ই,’ মিসেস মরিয়ম মিহি গলায় জবাব দেন। আর্দ্র গলার স্বরে যোগ করেন, ‘এখনই আমরা চলে যাবো,’ তুলতুলে নরম ব্যাগ থেকে কাগুজে রুমাল বার করে চোখের নিচে ধরেন, ‘আর্ট সেন্টারে ‘ফ্যানটম অফ দা অপেরা’র টিকিট কাটা আছে, প্রায় ছয়মাস আগে থেকে, বক্স অফিসের সিট…’ চোখের কোণা দিয়ে দেখি, মাথাতে দেড় ফুট লম্বা, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, ‘আর কিছু চাই তোমার? তোমাকে ভীষণ মিস করবো…’ ‘আমি ঠিক থাকবো!’ বিলের চাপা গলার উত্তর শুনি।

লম্বা করিডর ধরে হাঁটি। চিন্তা করি, অন্ততঃ দেড়ঘন্টা পরেও যদি আমাদের কাজ মিটিয়ে এখান থেকে বেরোতে পারি, পৃথাকে ওর বাড়ি পৌঁছিয়ে রিকের সঙ্গে শনিবারের কিছুটা সময় অন্ততঃ কাটাতে পারবো। অর্কর কথাও ভাবি, কলেজ পড়াকালীন প্রতি দিন তিনটে ঘর পেরিয়ে ওকে নিজের ঘরে ঢুকতে হবে।

বেশি দূর যেতে হয় না, একটা তীক্ষ্ণ মহিলাকণ্ঠে চমকে উঠি।

‘না রজার না, এখানে না, এখানে তুমি ধূমপান করতে পারো না!’ আওয়াজটার উৎস সন্ধানে তাকাই।
পরনে চাপা জিন্স, কাঁধ ছাপানো খোলা চুল গাঢ় গোলাপী রঙে ছোপানো, গলায় কাঠের মালা, ডানদিকের ভ্রু, ওপরের ঠোঁটে চকচকে স্টিলের দুল, গহনা-বিহীন হাতের দশটা আঙ্গুলে বারোটা আংটি। ‘ভুলে যেও না রজার, এটা কলেজ ডর্ম, মদের বার নয়!’ মহিলা ভীষণ রেগে আছেন বোঝা যাচ্ছে। আমার হাঁটার গতি স্লথ হয়ে আসে।
‘আরে ছাড়ো তো! নিয়ম! কত্তো দেখলাম। হুঃ!’ হাতকাটা গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে নীল-লাল-সবুজের বাহারে উল্কি দেখা যাচ্ছে। মোটা ক্যানভাসের প্যান্ট, কোমরের বেড় ছাড়িয়ে প্রায় হাঁটু অবধি চলে এসেছে, পায়ে পাতলা একটা চটি, তাচ্ছিল্য ভরা পুরুষকণ্ঠের উত্তর। ‘কোন শালার বাপ বলেছে পারি না? শালা! পয়….শশশা দিচ্ছি না! এ্যই ছোঁড়া! ওই ভোগের স্মোক এলার্মের ওপর একটা তোয়ালে ফেলে দে তো! এই ব্যাটা… হুঁকোমুখো? দাঁড়িয়ে আছিস কী?’
‘থামো বলছি! ভরদুপুরে মদ খেয়ে ছেলেকে কলেজে ভর্তি করতে এসেছে,’ মহিলা কণ্ঠের পারদ আরো দু-খেপ উঠে আবার খাদে নেমে যায়, ঘরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলেন, ‘সোনা ছেলে আমার, মুরগী-ভাজা গুলো সময় মতো খেয়ে নিও, সসটা একটু ঝাল আছে, কলেজ জীবন উপভোগ করো, আমি…আমরা চললাম।’
‘বাই টমাস!’ কথা জড়িয়ে যাচ্ছে রজারের।
‘টমাস না ইডিয়েট! ও ম্যাথিউ! দিবারাত্র গিলে বসে আছে, শয়তান…’ ‘ঐ একই হলো…’ রজারের পা টলছে।

ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে ‘হুঁকো-মুখো সোনা ছেলে ম্যাথিউ’র মুখ দেখার চেষ্টা করি, অন্ততঃ পক্ষে একটা ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ তো পেলো ছেলেটা!
‘না, না! মাসি!’ ইংরাজী ভাষার কোলাহলের পটভূমিকায় পরিষ্কার বাংলায় অর্কের গলা ভেসে আসে, ‘একদম তাকিয়ো না, সোজা চলতে থাকো… সোজা…’

দু’টো বন্ধ ঘর। তালা লাগানো, একটা ঘর থেকে রেডিওর আওয়াজ। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাতের জিনিস সামলে এগোতে থাকি।

‘আরে! মিসেস সানইয়াল নাকি!’ জুলিয়েটরর মা ডেবি স্মিথ, একেবারে চোখের সামনে, আর একটু হলে ধাক্কা লাগতো।

জুলিয়েট ঋকের সঙ্গে হাইস্কুলে পড়তো। জুলিয়েটের একটা ছোট ভাই আছে শুনেছিলাম।

‘হ্যাঁ, মানে, ওই একটু……’ ঘাড় ঘুরিয়ে অর্ককে দেখাতে গিয়ে দেখি ও লোকজনের পাশ কাটিয়ে সামনে চলে গেছে। ‘জুলিয়েট ভালো তো?’
‘কে জানে মাগী কোথায়? আমি এখানে এসেছি আমার ছেলে ববের জন্য’, আনন্দের আতিশয্যে ডেবী আমাকে জড়িয়ে ধরে, ‘খুশির কথা আর কি বলি, বব ভীষণ ভালো রেজাল্ট করেছে সায়ান্সে। তোমার রিকি কেমন আছে? বড্ডো ভালো ছেলেটা, সেই ছোটবেলা থেকেই কি ভদ্র, একটা মেয়ের মতো সহানুভূতিশীল, আবার একটা ছেলের মতো চৌকস, তুমি রত্নগর্ভা!’ ডেবী মুখ নামিয়ে আনে কানের পাশে, ‘আমার জুলিয়েটটা আমার তখনকার ছেলেবন্ধু স্টেফানের মতো বোকা ছিল! দুটোই ভেগেছে, ঢাকি সমেত প্রতিমা, তবে আমার ফিয়ান্সে রিচি, রিচার্ড, একেবারে অন্যরকম। দেবদূত, দুইমাসের আলাপেই এনগেজমেন্ট সেরে নিয়েছি, এবার বিয়েটাও করে ফেলবো, কি বলো? এইমাত্র এখানে ছিল!’ ওদের দুজনের কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ ডেবি আমার দিকে ফেরে, ‘কোথায় যে গেলো? তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতাম!’
‘থাক না এখন?’ চল্লিশ বছরের ডেবি দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন বিয়ে করতে চলেছে, সেই আনন্দে সামিল হই, ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলি, ‘পরে আলাপ হবে’। ভিড় কাটিয়ে পৃথা আর অভিরূপ এগিয়ে আসছে, দেখতে পেয়েছি।

অর্কের ঘরের বাইরে এসে থেমে যাই। ওর রুমমেট আগে থেকেই চলে এসেছে মনে হচ্ছে! আর এসেই নিজের দিকের ঘরের দেওয়াল সাজিয়ে ফেলেছে। ডর্মের চুনকালি-করা দেওয়ালে ব্রুস লী’র একটা বিরাট পোস্টার, তার একপাশে ভারতীয় ‘প্রকৃতি-পুরুষ’ এর চাইনিজ সংস্করণ ‘য়িন-ইয়াং’ প্রতীক। অর্ক বাইরে দাঁড়িয়ে, মুখ দেখে আন্দাজ করি, ঘরের সাজসজ্জায় একটু ঘাবড়ে গেছে, আমি হাসি, ‘আরে চিন্তার কি আছে? এক চিনাম্যান চাঁই চুই মালাই কা ভ্যাট…’ ওকে টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে এক বিরাট চমক খেয়ে চুপ করে যাই। চিন সম্পর্ক আরো কিছু লঘু মন্তব্য মাঝপথে গিলে ফেলতে বাধ্য হয়েছি… আঠারো-উনিশ বছরের এক ফুটফুটে বাঙালি ছেলে।

সাজানো দেওয়ালের একধারের বিছানার ওপর বসে, চোখ বন্ধ। দু’হাত ধ্যানের মুদ্রায় কোলের ওপর ফেলা। আমাদের দেখে ছেলেটি চোখ মেলে তাকায়, মিষ্টি হেসে আবার চোখ বন্ধ করে ধ্যানের মুদ্রায় ফিরে যায়। এবার আমার মুখ থেকে হইহই করে বাংলা-ইংরাজি মেশানো ক্ষমাপ্রার্থনা বেরিয়ে আসে, ‘সরি সরি, একেবারে ভুল হয়ে গেছে,’ তাড়াতাড়ি করে আবার বলি, ‘বেলা তো অনেক হলো, ক্ষিদে পায় নি তোমার?’ ছেলেটি আবার চোখ মেলে তাকায়, শান্ত স্থির দৃষ্টি, ক্রমান্বয়ে আমার দুটো প্রশ্নের উত্তর দেয়, ‘না, না, ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি। না, আমার ক্ষিদে পায় নি।’

অভিরূপ কড়া চোখে তাকিয়ে আছে দেখে পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টায় বলি, ‘তোমার বাবা মা সব কোথায়? তোমার জিনিসপত্র কোথায়? তোমার নাম কি?’
ছেলেটা আবার মৃদু হাসে, বলে, ‘বাবা মা? বাবা…, মা…,’ মাথা তুলে একটু ভেবে তারপর বলে, ‘সম্ভবতঃ নিচে চা আনতে গেছে। আমার জিনিষপত্র এই তো, এই যে বই-খাতা-পেন, জামা জুতো সব তো এইখানেই, ওই র‍্যাকে, আর কী দরকার? আমি জয়ন্ত ওরফে জনি রিচার্ডসন টেইলার।’ ‘ও, ভালো কথা’।

অভিরূপ আর পৃথাও এসে গেছে, আমরা সবাই মিলে লেগে পড়ি। সব ভারী জিনিসও এসে গেছে, এখন ঘরের নানা জায়গায় রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোয়েভ বসিয়ে যন্ত্রপাতিগুলো চালু করতে হবে, আমি অর্কের দিকের বুক-শেলফে বই তুলি, গুছোতে থাকি। বই তো নয়! এক-একটা বড়ো বড়ো পাথর সব।

মাইক্রোয়েভের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে বার বার আড়চোখে জনির দিকে তাকাই, কি সুন্দর ছেলেটা! ঘরের মধ্যে এতগুলো লোক, কোন তাপ উত্তাপ নেই! শুধু কয়েকটা বই, আর সামান্য কয়েকটা জামাকাপড় নিয়ে কলেজে পড়তে চলে এসেছে। আবার সটান হয়ে বসে ধ্যান করছে। দুই বিপরীতের প্রতীকী য়িন-ইয়াং টাঙিয়েছে ঘরের দেওয়ালে। জনির মাকে দেখার কৌতুহল হয়। এখনো এলো না? কি রকম ‘মা’? আমার ছেলে যখন কলেজে গিয়েছিল আমরা এক সপ্তাহের ছুটি নিয়েছিলাম। হঠাৎ ধরা পড়ে যাই। চোখাচোখি হতেই ও সম্ভ্রমের সাথে চোখ নামায়, ওকে সহজ করার জন্য বলি, ‘তুমি বাঙালি নও তাহলে?’ অর্ক বাংলা বোঝে কিন্তু কথা বলতে চায় না সহজে, ওকে শুনিয়ে ছেলেটিকে বলি ‘বেশ তো বাংলা বলো তুমি……..’
ছেলেটি মাথা নাড়ে, ‘অনলাইনে এখন যে কোন ভাষা শেখা যায়, ভাবলাম মাতৃভাষাটা শিখে রাখা ভালো।’
‘তা আর বলতে? মাতৃভাষা? শেখার ইচ্ছা… অনলাইন…’ অনেক কয়টা প্রশ্নের তীর মনে ভিড় করে এসেছে, কিন্তু তার আগেই দুটি সুদর্শন সাদা চামড়ার আমেরিকান যুবককে ঘরের মুখে দেখে চুপ করে যাই।

‘হ্যালো হ্যালো, হেই….., দেখো! দেখো, লি’ল জনির রুমমেট এসে গেছে!’ রোদে পুড়ে গায়ের সাদা রঙ উজ্জ্বল তামাটে বর্ণ, মেদবিহীন লম্বা দোহারা চেহারা, পরিপাটি জামা প্যান্ট, ফেট্টি বাঁধা মাথার চুলে, পায়ে দৌড়োনোর জুতো, হাতে চায়ের কাপ। বয়স চল্লিশের বেশি না, সম্ভবতঃ জনির বড়ো দাদার বন্ধু, বিশেষ একটা পাত্তা দিই না, ওর দায়িত্বজ্ঞানহীন ‘মা’টিকে দেখার কৌতুহলটা বেড়েই যাচ্ছে!

‘রনি-জেফ্রি!’ জয়ন্তকে এই প্রথম উত্তেজিত হতে শুনি, ও অর্ককে দেখায়, ‘এই যে আমার রুমমেট অর্ক। ও বাঙালি।’
‘বাঃ, দারুণ,’ ওরা দুইজনে পালা করে জয়ন্তকে আদর করে, গালে চুমু খায়। ‘ভালো হলো, এবার তুমি প্রাণ ভরে বাংলা বলতে পারবে।’

আমাদের কাজ প্রায় হয়ে গেছে, আমরা সবাই একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই, পরিচয় দিই, ‘সান্যাল দম্পতি, অর্কের পড়শি, ওর মা পৃথার সাথে এসেছি।’

জনি তাকায় আমাদের সবার দিকে, ছেলেদুটোকে দেখিয়ে ওর নরম গলায় বলে, ‘এ রোনাল্ড রিচার্ডসন আর ঐ জেফ্রি টেইলার,’ তারপরে আমার দিকে ওর স্নিগ্ধ ধ্যান-গম্ভীর চোখ তুলে বলে ‘আপনি তখন জানতে চেয়েছিলেন,’ তারপরে ইংরাজিতে যোগ দেয়, ‘এরাই আমার বাবা-মা।’

জনির কথা শেষ হতে না হতেই আমাদের সচকিত করে ছেলেদুটো সমস্বরে ‘ইপপি….’ বলে আনন্দের চিৎকার করে ওঠে। কোনোরকমে আমাদের বাড়ানো হাতে হাত ছুইয়ে পরিষ্কার বাংলায় ‘নমস্কার’ বলে ছেলেগুলো এইবার সমবেত ভাবে হোহো হাহা করে হেসে ওঠে।

‘বাবা-মা? বা…বা …মা? …লি’ল জনি? আমি মা, আমি মা কিন্তু, … প্লীজ! আর আমাদের রনি? ও জনির বাবা। ঠিক তো?’ সঙ্গে সঙ্গে রনিও প্রতিবাদ করে ওঠেছে, ‘কক্‌খনো! স্বপ্ন দেখছো! না, না জেফ তুমি বাবা, আমি মা, জনি ছোটবেলায় আমায় মা বলতো!’
‘তখন ও সবে একমাসের!’
‘তখন তোমার লম্বা চুল ছিল!’
‘তুমি রান্না ঘরে শিস দিয়ে গান করো!’
‘তুমি লাল রঙের সোয়েটার পরো!’
‘তুমি ট্রমবোন বাজাও!’

ওরা একে ওপরকে নানা তুচ্ছ কারণ ধরে খ্যাপাতে থাকে আর নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে জোরে জোরে হাসতে থাকে। ওদের সঙ্গে হাসিতে জনিও যোগ দেয়। যেন কি একটা ভীষণ মজার কথা বলা হয়েছে।

জনির উজ্জ্বল চোখে মুখ ভরা হাসি, জেফ্রি আর রনির সমবেত আনন্দোছ্বাস মিলেমিশে এক হয়ে যায়। সেই গভীর মঙ্গলময় অনুভূতি আমায় আচ্ছন্ন করে দেয়, আমি সেই তৃপ্তির আবেশে ভাসতে থাকি।

আর তখনি বিদ্যুৎচমকের মতো সেই আনন্দময় কুয়াশার মতো ভিতর থেকে আমার একমাত্র সন্তান ঋকের মুখ ভেসে ওঠে। আমি ঋককে, আমার সন্তান রিকিকে দেখতে পেয়েছি জেফ্রি আর রনির অনাবিল স্বাভাবিকতায়।

এতক্ষণে ও ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়েছে, পরিপাটি করে বিছানা তুলে, নিখুঁত হাতে কফি ঢেলে, প্রাতঃরাশ খাচ্ছে। হাসিখুশী, প্রাণবন্ত, বুদ্ধিদীপ্ত।

আমি একদৃষ্টে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনের গভীরতম সুড়ঙ্গে, কঠিনতম সিন্দুকে লুকিয়ে রাখা অনেক গুলো কঠিন প্রশ্নের জবাব একটা উত্তরেই পেয়ে গিয়েছি। ঋকের শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে, মুখোমুখি হয়েছি যেই প্রশ্নগুলির, এবং তার উত্তর জানতে পেরেও মানতে পারি নি, তাকে আজ চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি। একটা কঠিন ভার নেমে যাচ্ছে আমার বুক থেকে।

চমক ভাঙ্গে অভিরূপের কনুইয়ের একটা ছোট্ট ধাক্কায়। ও ইশারায় বলে, ‘কাজ শেষ। চলো এবার।’

পৃথা নেমে গেছে, অভিরূপ আবার ড্রাইভারের সিটে। দেড়ঘন্টার রাস্তা। সূর্য মধ্যগগনে, তবুও কি কারণে জানি না, চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় মনটা ভরে আছে। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে হঠাৎ অভিরূপ বলে ওঠে, ‘ওরা বেশ আছে না?’
আমি চমকে উঠি, ‘কারা?’
‘ওই যে গো, ওরা, রোনাল্ড আর জেফ্রি?’

আমি সম্মতির মাথা নাড়ি। ও যা ভাবছে আমিও এই মুহূর্ত হয়তো ঠিক তাই ভাবছি? অভিরূপ হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা ওর কোলে তুলে নেয়। ‘হ্যাঁ গো, যা বলেছো।’ আমার গায়ে শিহরণ জাগে, একটা চেনা অনুভূতি, আমি ওর পিঠে হাত রাখি। আমার হাতের ছোঁয়ায় ও কেঁপে ওঠে।

About this blog

hit counter

Sample text

ফেসবুকে আমাকে ফলো করুন

ভিজিটর কাউন্ট

Resources

মোট পোস্ট হল

জনপ্রিয় পোস্ট গুলি

আজকের তারিখ হচ্ছে

Powered by Blogger.

Ads 468x60px

Social Icons

সমস্ত পোস্ট গুলি এখানে

Featured Posts