সুগত সান্যাল

 

গল্পের নাম পড়ে যদি ভেবে থাকেন আমি কলকাতার ইডেন গার্ডেনে আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি এবং সেখানে ডাইনোসর দেখাবো, সেটা মারাত্মক ভুল হবে। এই ঘটনা আরো অনেক গভীর।
আমার বন্ধু প্রফেসর প্রশান্ত বোস একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক। ওঁর একটা পি এইচ ডি ডিগ্রি আছে পদার্থবিদ্যাতে। তবে আমি ভেবে পাই না যে পৃথিবীর কোন বিষয়টা ওঁর অজানা। মলিকিউলার বায়োলজি থেকে থিওরি অফ রিলেটিভিটি, সবেতেই ওনার সমান আগ্রহ।
আমি কমলেশ মিত্র, প্রশান্ত বাবুর বাড়ির কাছে একটা ছোট মেসে থাকি। বি কম পাস করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কেরানির কাজ করি। উনি আমায় বেশ ভালোবাসেন কিন্তু সেটা যে কেন আমি বুঝতে পারি না। উনি তো ইচ্ছে করলেই অনেক বাঘা বাঘা লোকের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন। তবে হ্যাঁ, উনি যখন কথা বলেন, আমি সাধারণতঃ চুপচাপ থাকি, মন দিয়ে সব কথা শুনি, আর মাঝে মধ্যে ‘হাঁ’ ‘না’ বলে নিজের অস্তিত্ব জানান দিই। প্রফেসর বোস অনেক কিছু বলে যান, উনি জানেন আমার কাছ থেকে কোন খবর কারো কাছে যাবে না। আগে অনেক লোক ওঁর সঙ্গে কথা বলে বুদ্ধি নিয়েছে আর তারপর যন্ত্রপাতি তৈরি করে টু-পাইস ইনকাম করেছে। প্রফেসর বোস টাকা অথবা খ্যাতি, এসবের জন্য পরোয়া করেননা। ওঁর নিজের প্রচুর টাকা, আর বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকেও প্রচুর পেয়েছেন। ব্যক্তিগত নাম-ডাকের কোন মোহও ওঁর নেই। তবে কেউ ওঁকে বোকা বানিয়ে চলে যাবে সেটা উনি সহ্য করতে পারেন না। অসৎ লোকের ধারে কাছে উনি থাকেন না।
প্রশান্ত বাবুর একটা ভালো অভ্যাস আছে। উনি যদিও থিয়োরিটিক্যাল বিষয়ে পি এইচ ডি করেছেন, বিভিন্ন ধরণের যন্ত্র তৈরি করা ওঁর সখ এবং উনি তাতে খুব আনন্দ পান। মানসিক ইচ্ছা দিয়ে চালানো যে ওভেন এবং টোস্টার উনি তৈরি করেছেন, সেটা দেখলে লোকে পাগল হয়ে যাবে। তবে আমি কঠিন ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কাউকে কোন দিন কিছু বলতে পারব না, আর আমিও কখনো ওঁর বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি।

একদিন সন্ধ্যাবেলা মুশলধারে বৃষ্টি নেমেছে, আমি এসে জমে গেছি, খুব গল্প হচ্ছে। নরহরি, ওঁর কাজের লোক, এক থালা চিকেন পকৌড়া দিয়ে গেছে। এখানে এলে আমার খাওয়াটা বেশ জমাটি হয়। ছুটির দিনে দুপুরের আর প্রায় প্রতি রাতেরই খাওয়া আমার এখানেই হয়।
সেদিন উনি হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কমলেশবাবু, আপনার কি বহু পুরনো দিনের জীবন্ত প্রাণী দেখতে ইচ্ছে করে?”
আমি ভাবলাম, এবার আবার নতুন কি চিন্তা ওঁর মাথায় খেলছে। এত বড় এক জন প্রতিভাশালী মানুষের ভাবনার ধারা বোঝা শক্ত। আমি বললাম, আমার ইচ্ছে করে পিরামিড তৈরি, তাজমহল তৈরি হওয়া দেখতে। দা ভিঞ্চি মোনালিসা আঁকছেন দেখতে পেলেও ভালো লাগবে।
প্রশান্তবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন। ওঁর বক্তব্য হোল যে আমার চিন্তাধারার মাপটা ছোটো। আমি শুধু কয়েক হাজার বছরের গণ্ডীতে ভাবছি। আর ওঁর মন ভাবছে লাখ লাখ অথবা কোটি কোটি বছরের মাপে। আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে আমি এই মাপে ভাবিনি। আমি সহজে হার স্বীকার করাতে উনি খুশী হয়ে ওঁর চিন্তাধারার রাশ আলগা করলেন। আমি বহুবার দেখেছি যে এটাই সব থেকে সহজ।

উনি বললেন যে উনি বহুদিন ধরে এই নিয়ে চিন্তা করে আসছেন। আর অনেক কিছু কাজ এবং অঙ্ক কষে ফেলেছেন, এরই মধ্যে। আমি অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি দেখেছি যে ওঁর চিন্তাধারার গতি এবং দিক বোঝা শক্ত। তার চেয়ে সহজ হল ওঁকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়া। আর তাতে উনিও খুব খুশী হন। ওঁর আনন্দ হল একদম নতুন কিছু তৈরি করায়, যে সব জিনিষ সাধারণ লোক কল্পনাও করতে পারবেনা। টাকা বা যশ, এসবে ওঁর কোন মোহ নেই। তাই উনি পেপার লেখা বা পেটেন্ট নেওয়ার ব্যাপারে খুবই উদাসীন এবং শুধু মুষ্টিমেয় কিছু বৈজ্ঞানিকই ওঁর খ্যাতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল।
বেশ কিছু বছর আগে উনি ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। আমরা দুজনে সেই যন্ত্র চড়ে ‘আলাস্কা’ ঘুরে এসেছিলাম। কিন্তু এতো বেশি ঠাণ্ডা সেখানে যে আমি ওঁকে প্রায় পায়ে ধরে ফেরৎ এসেছিলাম, কিছুই দেখা হয়নি। ওঁর তৈরি ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্রটা দেখতে খুবই সাধারণ, একটা পুরনো কার্পেটের মতন। উনি ওই কার্পেটের ওপর এক বিশেষ পদ্ধতিতে একটা রাসায়নিকের সংযোজনা করেছেন, তা ছাড়া কিছু দিক এবং গতি পরিবর্তনের যন্ত্র লাগানো আছে, তার বিশদ বিবরণ শুধু উনিই জানেন। আজকাল ওটাকে দিয়ে ওঁদের দাদুর আমলের পিয়ানোটা ঢাকা থাকে, তাতে লোকের বিশেষ নজরে পড়েনা। উনি সব সময়ে ওঁর এই ঘরটি নিজের তৈরি ‘ম্যাজিক তালা’ দিয়ে বন্ধ করে রাখেন। এই তালার একটা মহা গুণ হোলো যেই প্রধান দরজাটাতে ম্যাজিক তালা পড়ে, বাকী দরজা ও জানলাগুলো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। আমি এর সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারবো না, কিন্তু একটা মজার কথা বলি, কেউ যদি কোনও জানলা বা দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করে, তার কপালে জোটে এক রাম চড়। বেশ জোরাল চড়। আমি চড় খাওয়া লোকের কান্নার শব্দ শুনছি। আমরা সেদিন অন্য ঘরে বসেছিলাম।

ভাগ্যবশতঃ, প্রশান্ত বাবু আমাকে খুব স্নেহের চক্ষে দ্যাখেন। আমাকে কোনও জিনিস বোঝাতে হলে উনি একদম সহজ করে শুরু করেন। আর শেষ অব্দি আমিও বুঝে যাই। ওঁর বোঝানর ক্ষমতাও অসাধারণ। এর সব কিছুর শুরুতে হচ্ছে আমার ওপর ওঁর বিশ্বাস।
উনি আমাকে বললেন, “কমলেশবাবু, আমি একটা যন্ত্রের কথা ভাবছি, যেটা আমাদের অতীতে… বহু প্রাচীন সময়ে কি ঘটেছিল, সেটা দেখতে সাহায্য করবে।” আমি একটু অবাক হলাম। আমি এই ধরণের যন্ত্রের কথা গল্পের বইয়ে পড়েছি, তবে কারো সঙ্গে এই নিয়ে কখনো কথা হয়নি। আরো জানার আগ্রহে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এই যন্ত্রের ব্যাপারটা একটু বিশদে জানান না, সহজ করে, আমার বোঝার মতন করে।”
“এটা খুবই সহজ ব্যাপার। আমি বেশ কিছুদিন হোলো, এর বৈজ্ঞানিক থিওরি, সব অঙ্ক কষে ঠিক করে রেখেছি,” প্রশান্ত বাবু জানালেন। “আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আপনি তো শুনেছেন লোকে বলে যে ‘তারা’ বিস্ফোরণ হওয়া দেখেছে। বৈজ্ঞানিকরা এই ঘটনাকে ‘সুপারনোভা’ বলে থাকেন। আসলে আপনি যেটা এখন দেখছেন, সেই তারার বিস্ফোরণ হয়তো কোটি কোটি বছর আগে হয়েছে, এবং সেই আলো এত বছর বাদে এসে আমাদের কাছে দেখা দিয়েছে। আপনি যেটা এখন দেখছেন, সেই বিস্ফোরিত তারা এখন পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছে, বহুদিন আগে।”
আমি খুব বাধ্য ছেলের মতন মাথা নাড়ালাম। সত্যি কথা বলতে কি, কোটি কোটি বছর আগে তারার বিস্ফোরণ এবং আমাদের বহু প্রাচীন জীবিত প্রাণী দেখা, আমি এর মধ্যে কোন সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে ঠিক সময়ে প্রশান্ত বাবু নিজেই সব সমাধান করে দিয়ে থাকেন।
প্রশান্ত বোস আরো বিশদভাবে এই অতীতের জীব দেখবার ব্যাপারটা বোঝাতে শুরু করলেন। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমার সেই ‘টেলিপোর্টিং’ যন্ত্রের কথা মনে আছে কিনা? আমি জোরে ঘাড় নাড়লাম, আমি কি করে সেই ‘আলাস্কা’ ভ্রমণের কথা ভুলে যাব।
প্রশান্ত বাবু জানালেন যে আমরা যদি পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে যেতে পারি, তাহলে আমদের বহু পুরনো দিনের ঘটনা দেখতে পাওয়া উচিৎ। আমি এবার আরো জোরে ঘাড় নাড়লাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন মাথাতে সমানে পাক মারছিল, অত দূর থেকে আমরা পৃথিবীতে কিছু দেখব কেমন করে? আমি ওঁকে এটা জিজ্ঞেস করলাম।
উনি আমার এই প্রশ্ন শুনে খুব খুশী হয়ে উঠলেন। বললেন, “খুব ভাল বলেছেন, এটা তো মাথাতেই আসেনি। শুধু দূরে যাওয়াটা নিয়েই ভেবেছি।” ওঁর মতন একজন বড় বৈজ্ঞানিক এই বিরাট প্রয়োজনীয় ব্যাপারটা ভুলে গেছিলেন, তাতে ওঁর বিন্দুমাত্র ক্ষোভ হয় নি। উল্টে উনি আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমারও বেশ খুশী খুশী লাগছিল। উনি বললেন এটার উত্তর খুঁজে পেতে কিছু সময় লাগবে। আমি রাজী হয়ে গেলাম।

সেদিন ছিল শুক্রবার, তারপর একটা পুরো সপ্তাহ কেটে গেলো, কিন্তু প্রশান্ত বাবুর কোন খবর নেই। আমি এক দিন ওঁর বাড়ি গিয়ে নরহরিকে জিজ্ঞেস করে এলাম, সেও কোন কিছু বলতে পারলো না। খালি বলল যে সে মাঝে মাঝে প্রশান্ত বাবুকে পাতলা কাঁচ অথবা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল জাতীয় জিনিস নিয়ে বাড়ীতে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেছে। নরহরি ঠিক পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারলো না। আমিও বুঝলাম যে অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আমাদের আর কিছু করার নেই।

পরের সপ্তাহের সোমবার সকালবেলায় হঠাৎ ডাক এলো। মেসের ম্যানেজার বাবুর ঘরে দেখি নরহরি, হাঁপাচ্ছে, এক গ্লাস জল শেষ করে আর এক গ্লাস জল খাচ্ছে। আমাকে বলল যে প্রশান্ত বাবু আমাকে এখুনি ওর সঙ্গে যেতে অনুরোধ করেছেন। আমি যেন কয়েক দিনের মতন কাপড়-জামা নিয়ে যাই। বুঝতে পারলাম যে আমাদের আবার অনির্দেশ যাত্রার পালা এসেছে।
আমি অবশ্য মনে মনে এই যাত্রার জন্য তৈরি ছিলাম। কথা বলে সময় নষ্ট না করে আমি দু-তিনটি শার্ট-প্যান্ট নিয়ে নিলাম। আর আলাস্কার অভিজ্ঞতা মনে রেখে আমার ঠাকুরদাদার দেওয়া একটি বিশাল ওভারকোটও নিলাম। এই ওভারকোট উনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সৈন্যদের ‘ওয়ার-সারপ্লাস’ দোকান থেকে কিনেছিলেন, ওঁর পরে বাবা, বাবার পরে এটা এখন আমার কাছে এসেছে। তবে কে জানতো যে আমাদের এইবারের ভ্রমণের পরিধি অনেক অনেক বেশি হবে।
প্রশান্তবাবুর বাড়ী গিয়ে দেখি উনি বেশ উত্তেজিত। সমানে পায়চারি করছেন বসার ঘরেতে। এক কোনে দুটি অদ্ভুত যন্ত্র রাখা আছে। এর মধ্যে একটা আমাদের পুরনো ম্যাজিক কার্পেট। সেটাকে ঝাড় পোঁছ করা হয়েছে আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচার মত জিনিসের মাথায় সেটা রাখা রয়েছে। খাঁচার সামনেটা খোলা। ভেতরে দুটি বসার জায়গা রয়েছে। অনেকটা যেন পালকির মতন দেখাচ্ছে। আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করাতে উনি ওনার মার্কামারা সূক্ষ্ম হাসিটা হাসলেন। “মনে পড়ে কমলেশ বাবু, গত বার আলাস্কা থেকে ফেরার পথে আপনি কার্পেট থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমরা খুব দ্রুত বেগে আর অনেক উঁচু দিয়ে আসছিলাম। তাই এবারে এই ব্যবস্থা করেছি। এতে আমরা একটু আরামে বসতেও পারব আর মজা করে সারা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে ঘুরতেও পারবো।” ঘটনাটা যদিও মজার বলে মনে হচ্ছিল না, কিন্তু মনে হোল এখন চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই আস্তে আস্তে পরিস্কার হবে, ওঁর পরের কথাতে কিছুটা আলোকপাত হোল।
“দেখুন কমলেশ বাবু, আমরা যদি অনেক পুরনো ঘটনা দেখতে চাই, তা হোলে আমাদের পৃথিবীর থেকে দূরে যেতে হবে, তাই না?” আমি সায় দিলাম। প্রশান্ত বাবু বললেন, “তা হলে ডাইনোসর দেখতে হলে আমাদের অনেক অনেক দূরে যেতে হবে।” দূরত্ব বোঝাতে উনি বেশ কিছু অঙ্ক আমাকে দেখাতে উৎসাহী হয়ে উঠছিলেন, আমি তাড়াতাড়ি বিষয়টা পালটে ফেললাম। অঙ্ক নিয়ে আমি কি করবো? আসল ঘটনা দেখতে পেলেই আমি খুশী।
“ইয়ে… বহু দূর থেকে দেখার ব্যাপারটা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। উনি একটা হাল্কা হাসিতে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে ওঁর ব্যাপারটা মনে আছে। উনি দুটো বাইনোকুলার জাতীয় যন্ত্র বের করলেন। আমি ভাবলাম যে এই দিয়ে কোটি কোটি মাইল দূর থেকে কি দেখা যাবে? আমার ছোটবেলায় একটা মেলা থেকে কেনা বাইনোকুলার ছিল। তাতে একটা আমগাছের ডালপালা পরিস্কার দেখা যেতো, তবে ফুট কুড়ির বেশি দূরের জিনিস দেখতে মোটেই সুবিধে হত না।
প্রশান্ত বাবু আমার মনের কথা বুঝে নিলেন। বললেন, “এই বাইনোকুলার সাধারণ জিনিস নয়। এটাতে একটা বিশেষ পদার্থ লাগান আছে, যেটা দূরত্ব অনুসারে দেখার জোর বাড়ায় বা কমায়। অতএব, আপনি একশো ফুট বা এক কোটি মাইল, যত দূর থেকেই দেখুন, আপনি একই রকম পরিস্কার ভাবে সব জিনিস দেখতে পাবেন।”
সকাল সকাল বিশাল পরিমাণ জলখাবার খেয়ে আমরা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করলাম। নরহরিকে বলা হোল যে কেউ যদি আমাদের খবর চায়, তাকে বলা হবে যে আমরা কমলেশ বাবুর গ্রামে বেড়াতে গেছি ।

প্রশান্ত বাবু আর আমি, দুজনে ম্যাজিক পালকিতে উঠে বসলাম। আমি ওভারকোটটাও পরে নিয়েছিলাম, আর প্রচণ্ড ঘামছিলাম। যাত্রা শুরুর আগে, আমি আমাদের সব দেব-দেবীকে মনে মনে প্রণাম করে নিয়েছি, প্রশান্ত বাবু এসবে খুব একটা বিশ্বাস করেন না।

অতীতের দিকে যাত্রা

আমাদের যাত্রা শুরু হোল। প্রশান্ত বাবু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন অনেক দূর অতীতে যাবার আগে, আমি কোন কাছাকাছি ঘটনা দেখতে চাই কিনা। আমি বললাম প্রথমে পিরামিড তৈরী দেখতে চাই। প্রশান্ত বাবু ম্যাজিক পালকির কন্ট্রোল প্যানেলের সুইচ নিয়ে খুটখাট শুরু করলেন।
আমরা প্রচণ্ড গতিতে চলেছি। দূরে পৃথিবী একটা ছোটো বিন্দুর মতন দ্যাখাচ্ছে। আমাদের বিশেষ বাইনোকুলার দিয়ে দেখি বেশ পরিস্কার দেখাচ্ছে সব। আর এই যন্ত্রের একটা বিশেষ গুণ হোল, যে এটা মানুষের চিন্তাধারা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পৃথিবীর যে কোন একটা জায়গা দেখতে হোলে, সেই জায়গার কথা মনে করলেই সেখানকার ছবি ফুটে ওঠে। আমি মনে মনে পিরামিডের কথা চিন্তা করতে না করতেই দেখি কয়েক শো লোক বিরাট বিরাট পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জায়গাটা মোটেই মরুভূমি নয়, বেশ ঘাসে ঢাকা, আমি সন্দেহ প্রকাশ করাতে, প্রশান্ত বাবু জানালেন যে তখন ঐসব জায়গা বেশ সবুজ ছিল। মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে অনেক পরে। পিরামিড দেখা হোল খুব দ্রুত গতিতে।

আমরা পৃথিবী থেকে আরো অনেক দূরের দিকে পাড়ি শুরু করলাম। মাঝখানে মনে হোল যে এক ঝলক মায়া সভ্যতার আভাস দেখতে পেলাম। আমদের পালকি তখন প্রচণ্ড গতিতে চলেছে। প্রশান্ত বাবু ডাইনোসর দেখবার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। হঠাৎ দেখি দূরের পৃথিবীতে মানুয দেখা যাচ্ছে তবে তাদের চেহারা একটু অন্যরকম। তাদের দেখতে অনেক বড় এবং তারা কুঁজো হয়ে হাঁটছে। আমি বললাম, “প্রশান্ত বাবু, এরা কারা?” ঊনি ভাল করে তাকিয়ে দেখে বললেন যে এরা আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষ ।
বুঝলাম যে এসব দেখাও কপালে ছিল । অবশ্য প্রশান্ত বাবুর তৈরী ওই বাইনোকুলার না থাকলে এসব দেখা কপালে হোতো না ।

দেখতে দেখতে বেশ কিছু ঘণ্টা কেটে গেছে। আমার একটু ঘুম পেয়ে গেছিল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি যে পৃথিবীর একটা জায়গায় বেশ কিছু হাতির মতন জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে তারা হাতির থেকে আকারে অনেক বড় আর গলা বেশ লম্বা, অনেকটা জিরাফের মতন। আমার ঘুম পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে এই দেখে। আমি বুঝতে পারলাম যে আমরা ডাইনোসর বা ঐ জাতীয় কিছু জীবদের দেখছি। প্রশান্ত বাবুকে জিজ্ঞেস করাতে উনি সজোরে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
প্রশান্ত বাবু ম্যাজিক পালকি চালিয়েই চলেছেন। মুখে এক অদ্ভুত হাসি। আমি ভাবলাম যা দেখার জন্য আসা, সে সবই তো দেখা হোল, এবার তো ঘরে ফিরলেই হয়। প্রশান্ত বোস কোন কথা না বলে পালকির গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন।

আরো অতীতের দিকে

আমার ভ্রমণপর্বের এই অংশটা সব মনে নেই ঠিক মতন। যেটুকু মনে আছে তাতেই এখনো মাথা ঘুরে যায়। আমি এটুকু বুঝেছিলাম যে প্রশান্ত বাবু শুধু ডাইনোসর দেখেই থামবেন না, ওঁর মাথায় আরো কিছু দেখার মতলব আছে।
হঠাৎ আমার নজরে পড়লো যে পৃথিবীর কোথায় কে জানে সুন্দর বাগান। সেখানে গাছ, ফুল, ফল সব দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম এত সব দেখার পর এখন বাগান দেখে কি হবে! প্রশান্ত বাবুর মুখে হাসিটা লেগে আছে তবে চোখের দৃষ্টি কিরকম যেন। একটা জিনিস দেখতে পেয়ে আমি সোজা হয়ে বসলাম। একটা বিরাট সাপ এঁকে বেঁকে চলেছে, এদিক ওদিক ঘুরে একটা গাছে উঠতে লাগল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি ওটা একটা বিরাট আপেল গাছ।
আমার হঠাৎ মনে হল এটা সেই বিখ্যাত গার্ডেন অফ ইডেন নয় তো? দুটি মানুষকেও দেখতে পেলাম। প্রশান্ত বাবু ইচ্ছে করে ঐ মানুষদের একটু আবছা রেখেছেন। ওঁর যন্ত্রের কন্ট্রোল ঠিক করাতে দেখি যে আদম ও ইভকে দেখা যাচ্ছে, গায়ে কাপড়-জামা কিছু নেই। এটা আপেল খাওয়ার আগের অবস্থা ।
বলতে ভুলে গেছি, প্রশান্ত বাবু বিয়ে করেননি আর মেয়েদের সামনে উনি বেশ অপ্রতিভ হয়ে পড়েন, আর এখানে তো আরও মারাত্মক অবস্থা। সাপের বেশে শয়তান আর কিছু করার আগে, এবং ইভকে দিয়ে আদমকে আপেল খাওয়ানোর আগে, প্রশান্ত বোস তাঁর বৈজ্ঞানিকোচিত সংযম ভুলে গিয়ে কন্ট্রোলের যন্ত্রকে পুরো উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, আর আমাদের পালকি সোজা প্রশান্ত বাবুর বসার ঘরে এসে ধপাস করে পড়লো।
আমি হতভম্ব, এতবড় একটা ঘটনা দেখা হোল না। ওভারকোটটা খুলে ফেললাম। নরহরি কাছেই ছিল, তাকে বলতে না বলতে সে খুব কড়া চা আর খাবার নিয়ে এলো। এতটা ঘুরে আসার পরে আমাদের দুজনেরই খুব খিদে পেয়েছিল।

আমি প্রশান্ত বাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ডাইনোসর না আদম-ইভ, এদের কারা আগে এসেছিল, উনি উত্তর না দিয়ে অস্পষ্টভাবে খালি বললেন ওঁর ম্যাজিক পালকির কন্ট্রোলে একটু গন্ডগোল ছিল। ভেবেছিলাম যে এই পর্বের এখানেই ইতি, তা কিন্তু হোল না। কিছুদিন বাদে নরহরি ফের এসে উপস্থিত এবং আমি আবার গিয়ে পৌঁছলাম আমাদের আড্ডাখানায়। দেখলাম প্রশান্ত বাবু দুঃখী দুঃখী মুখ করে বসে আছেন ।

বর্তমান অবস্থা

আমি অনেক করে জিজ্ঞেস করাতে বললেন যে উনি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন। শয়তান স্বপ্নে এসে ওঁকে শাসিয়ে গেছে। বলেছে যে এরকম বিশ্রী অবস্থার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। সেই থেকে আমাদের অতীত ভ্রমণ বন্ধ।
আমরা আজকাল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেখানকার খাবার খাচ্ছি। পালকিতে একটা ছোট টুল লাগিয়ে নরহরিকেও মাঝে মাঝে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ লাগে। তবে এর মধ্যে একটা জায়গায় গেছলাম, যেখানকার লোকেরা কাঁচা খাবার খায়, সে এক বাজে অভিজ্ঞতা। ওখান থেকে ঘুরে আসার পর প্রশান্ত বাবু একটা নতুন সর্ব-হজম-ক্ষম বড়ি তৈরী করছেন!!!!

সুব্রত মজুমদার

 

মনে আছে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম যখন আমি কলেজের ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়তে ঢুকেছিলাম। কোলকাতার আশেপাশের কোন একটা ছোট জায়গা থেকে এসেছিল। মনে আছে এই কারণে নয় যে মেয়েটি ডাকসাইটে সুন্দরী বা অসাধারণ ভালো পড়াশুনায় ছিল বলে। বরঞ্চ উল্টোটাই বলা যেতে পারে। মেয়েটির চেহারার মধ্যে ছেলেদের আকর্ষণ করার মত বা মেয়েদের হিংসে করার মত কিছু ছিল না। সাধারণ সাজপোষাক পরে সাধারণ চেহারাটাকে আরও সাধারণ করে রাখত। মাথার চুলকে টেনে বেঁধে একটা বড় খোঁপা আর সাদা পোষাকেই সবসময়ে দেখতাম তাকে। কপালে দিত না টিপ ঠোঁটে মাখত না কোন রঙ। আমাদের ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যা ছিল এগারো, ওই মেয়েটি আসার পর হল বারো। আমরা ছেলেরা আড়ালে বলতাম দ্যা ডার্টি ডাজ্‌ন্‌। আমরা লক্ষ্য করলাম যে মেয়েটি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলে না, নিজের মনে চুপচাপ উদাস হয়ে বসে থাকে। জোর করে প্রশ্ন করলে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে উত্তর দেয়। কথা বাড়াবার কোনরকম চেষ্টা করেনা। ওকে আমরা হাসতেও কখনো দেখিনি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেচে আলাপ করতে গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটির ঠান্ডা বরফের মত স্বভাবের জন্য বেশি দুর এগোতে পারেনি। অবশেষে সবাই একসময়ে আমরা হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। মেয়েরা বলত ওর নাকি ভীষণ দেমাক, আমরা ছেলেরা সেকথা মানতাম না। মেয়েটির নাম জেনেছিলাম আশা। আমরা অনেক রকম নাম দিয়েছিলাম মেয়েটির। কেউ বলত যোগিনী, কেউ বলত সরস্বতী ঠাকুর, আবার কেউ কেউ ডাকত মাস্টারনী বলে। মেয়েটির ডানদিকের গালের ঠিক মাঝখানে ছিল একটা ছোট্ট কালো রঙ-এর তিল। আমি মেয়েটির নাম দিয়েছিলাম তিলোত্তমা।

খবরটা প্রথম এনেছিল অনন্যা। ওর এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি আশার বাড়ির লোকেদের চেনাশোনা আছে। ওনারা আশাকে ছোট থেকে বড় হতে থেকে দেখেছেন। ছোটবেলার থেকে আশা নাকি খুব হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে। চেহারাতেও একটা লালিত্য ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল আশার জীবনে। জেনেছিলাম আশার বয়স উনিশ। বিয়ে হয়েছিল গ্রামাঞ্চলের এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে। বরের বয়স ছিল আশার থেকে অনেকটা বেশি। উপায় ছিল না। একে অভাবের সংসার, তারপর দেখতে ভালো না, রং ময়লা, বিয়ে হচ্ছিল না। বাবা আর মা অনেক ধার দেনা, অনেক পণের বিনিময়ে জামাইকে কিনেছিলেন। কিন্তু সুখ আশার কপালে লেখা ছিল না। বিয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আশার বর মারা যায় মোটর সাইকেল একসিডেন্টে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে দোষ দেয় তাদের ছেলের মৃত্যুর জন্য। অপয়া আর রাক্ষুসী বলে তাকে অপবাদ দেয়। অনেক কান্নাকাটি অনেক হাতেপায়ে ধরাধরি করেছিল আশা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন কাজ হল না। অবশেষে একদিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আশাকে তার বাপের বাড়ি তুলে দিয়ে গেল। অসহায় বাবা মা আর কি করবে, মেয়েকে তো আর ফেলে দিতে পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আশাকে তাঁরা আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। জীবনের ওপর বিতৃষ্ণায় আশা একবার আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সময়মত ধরা পড়ে যাওয়ায় বেঁচে যায়। অবশেষে এক কাকিমার প্রশয়ে আশা ঠিক করে ও পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কাকিমাই সব খরচা বহন করার ব্যবস্থা করেন। সব শোনার পর আশার ওপর আমাদের মন দুঃখ আর সহানুভূতিতে ভরে উঠেছিল। আমার সব বন্ধুরাই কোন না কোন ভাবে আশাকে তার অজান্তে সাহায্য করার চেষ্টা করত। কেন জানিনা আমি আশাকে কোন সাহায্য করিনি, উলটে আমি তার সঙ্গে ভয়ানক এক খেলায় মেতে উঠেছিলাম কাউকে না জানিয়ে।

আমি আশাকে প্রেমপত্র লিখতে শুরু করলাম। না খামের ভিতরে পোরা, সুন্দর রঙ্গিন কাগজে লেখা স্ট্যাম্প আটকানো চিঠি নয়। খাতার পাতা থেকে ছেঁড়া ছোট চিরকুটে লেখা প্রেমপত্র। আমি শুধু তিনটে কথা লিখতাম চিরকুটে – ‘আমি তোমায় ভালবাসি’। তক্কে তক্কে থাকতাম এবং সুযোগ পেলেই সবার অজান্তে আমার লেখা চিরকুটটা আশার বইয়ের দুটো পাতার মাঝখানে গুঁজে দিতাম। তারপর অনামি এক লেখকের চিরকুটে লেখা ওই তিনটি কথা পড়ে আশার কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আদিঅনন্তকাল ধরে চলে আসা পৃথিবী বিখ্যাত এই তিনটি কথায় ঘায়ল হয়নি এমন মানুষ দুনিয়ায় কোথাও আছে কি না আমার জানা ছিল না। প্রথম চিঠিটা লেখার পর প্রায় তিনদিন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করার পরেও আশার মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। ধরে নিলাম যে তার মানে হয় আশা বইটার ভিতরে রাখা চিরকুটটা দেখার সুযোগ পায়নি অথবা আশা মানুষ নয়। আমিও হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। একদিন সুযোগ বুঝে আবার একটা চিরকুট রেখে দিলাম দুটো পাতার মাঝখানে। প্রফেসর ক্লাসে আসার আগে আমরা ছেলেরা আর মেয়েরা নানারকম হাসি আর ঠাট্টায় মসগুল হয়ে থাকতাম। আর উনি ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথে সব বন্ধ হয়ে যেত। আশা কোনদিন আমাদের এই হাসিঠাট্টায় যোগ দিত না। একটা বইয়ের মধ্যে মাথা গুঁজে বসে থাকত। আজ আমি শুধু আশাকে লক্ষ্য করছিলাম। আজ যেন আশাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছে। মনের ভুল কিনা জানিনা, একটা পরিবর্তনও আশার মধ্যে মনে হল লক্ষ্য করলাম। সবসময়ে প্রথম সারির বেঞ্চে বসা আশাকে এর আগে কখন ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সারিতে বসা ছেলেদের দিকে তাকাতে দেখিনি। আজ দুবার দেখলাম আশা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল। একবার তো প্রায় আমার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। আমার বুকের ভিতরটা ধক্‌ করে উঠেছিল। ধরা পড়ে গেলাম নাকি? না দেখলাম ঘাড়টা ঘুরিয়ে আশা আবার সামনের দিকে ফিরে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। কোন ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে প্রফেসরকে প্রশ্ন করলে আশা আজকাল মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আশা যেন একটা কিছু খুঁজছে ওর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারতাম।

আমার খেলা চলতে লাগল। আমার চিরকুটে লেখা কথার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল আর সেই সঙ্গে পরিবর্তন হতে সুরু করল আশার ব্যবহারের। আশা আজকাল অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, পিছন ফিরে ছেলেদের দিকে তাকায়। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় না, ঠাট্টা ইয়ার্কিতেও যোগদান করে। আমার কেন যেন মনে হত আশার চোখদুটো সবসময় কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়। আমি যত আশার ব্যবহারের পরিবর্তন দেখতাম ততো মনে মনে খুশি হতাম। একবার একটা পরীক্ষা করার ইচ্ছে হল। চিরকুটে লিখলাম তোমায় হাল্কা নীল রঙ-এর শাড়ী আর খোলা এলোচুলে দেখতে চাই। পরের দিন ক্লাসে ঢুকে আশাকে দেখলাম না। লাস্ট বেঞ্চে বসে আগের দিনের হোমওয়ার্কটা তন্ময় হয়ে চেক্‌ করছিলাম শেষ বারের মত, জমা দেওয়ার আগে। অর্ণবের কনুইয়ের ধাক্কায় চমক ভাঙ্গল। অর্ণব আঙ্গুল দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বলল। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক অদ্ভুত ব্যাপার। যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ক্লাসের সব ছেলেরা আর মেয়েরা অবাক হয়ে তাদের সামনে দাঁড়ানো আশার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে বলে আশার সারা মুখে একটা লজ্জা মেশানো সুন্দর হাসি। সব থেকে অবাক হলাম আমি। আশার পরনে আজ হাল্কা নীল রঙ্গের শাড়ী আর চুলটা খোলা। কপালে পরেছে একটা বড় টিপ আর ঠোঁটে লাগিয়েছে একটা হাল্কা রং। আশাকে আজ সত্যি সুন্দর লাগছে দেখতে। মেয়েটা এত সুন্দর দেখতে আগে কখনো লক্ষ্য করিনি তো।

ভাগ্যের চক্র কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। আমার সুযোগ এলো এক নামকরা কলেজে এঞ্জিনীয়ারিং পড়তে যাওয়ার। একদিন সবাইকার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে আমি আমার নতুন কলেজ জীবনের জন্য যাত্রা শুরু করলাম। আশার কাছ থেকেও বিদায় নিয়েছিলাম অন্যদের মতই। অল্পদিনের আলাপে আলাদা করে আমাকে মনে রাখার কথা নয় আশার। আমাকে বিদায় জানিয়েছিল অন্যদের মতই। তাতে আন্তরিকতা হয়ত ছিল, ছিল না কোনরকম ঘনিষ্ঠতা। আমি শুধু মনে মনে বলেছিলাম তিলোত্তমা তুমি ভালো থেকো, তোমার ভালো হোক। তারপর অনেক যুগ কেটে গেছে। আমার জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। আমি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেছি। এখানে সাজানো অথচ একটি ছোট্ট নির্জন শহরে আমার বসবাস। এখানে আমার নিজের বলে কেউ নেই। একাকী নিঃসঙ্গতায় আমার জীবন কাটে। প্রায় দুটো যুগ কেটে গেছে দেশ ছেড়ে এসেছি। ফেলে আসা দেশের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। যখন মন খারাপ লাগে তখন মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে স্পঞ্জের মত ভিজিয়ে নিয়ে আসি যতটা পারি দেশের সব কিছুকে নিজের দেহে আর মনে। একবার দেশে যাওয়ার একটা সুযোগ এলো যখন আমন্ত্রণ পেলাম আমার এক নিকট আত্মীয়ের বড় মেয়ের বিয়েতে আসার জন্য। অনেক দিন দেশের কোন বিয়ে বাড়ি আমার যাওয়া হয়নি, তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।

দেখলাম বিয়ের ব্যাপারে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে আবার অনেক কিছু একই রকম আছে। আমার ওপর ভার পড়েছিল ছেলের বাড়ির লোকেদের আদর আপ্যায়নের যেন ত্রুটি না হয় তার খোঁজখবর রাখার জন্য। দেখলাম ছেলের বাড়ির লোকজন খুবই ভদ্র, তাঁরা অল্পেই খুশী, তাই আমার কাজ অনেক কম মনে হচ্ছিল। হঠাৎ ছেলের বাড়ির একজন আমাকে দেখে এগিয়ে এল। আমার নাম ধরে ডাকল। আমি চিনতে পারলাম। আমার সেই ছেলেবেলার বন্ধু অর্ণব। দুই বন্ধু ফিরে গেলাম অনেক বছর আগের সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে। এক ভদ্রমহিলা একসময়ে অর্ণবের কাছে এসে দাঁড়াল। অর্ণব আলাপ করিয়ে দিল। চিনতে পারলাম অনন্যাকে। আমরা তিনজনে মিলে গল্প জুড়ে দিলাম। আমাদের সব বন্ধুদের কথা শুনছিলাম অনন্যার কাছে। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল আশার কথা জানার জন্য। কিন্তু ভিতর থেকে কে যেন আমায় বাধা দিচ্ছিল। হঠাৎ অনন্যাই আশার কথা ওঠাল। জানতে পারলাম যে আশা ডক্‌টোরেট করেছে মাইক্রোবায়োলজীতে। নামকরা বিলিতি কোম্পানিতে উচ্চপদে কাজ করে আশা। বিয়ে করেছে, দুটি সন্তান, একটি ছেলে একটি মেয়ে। খুব সুখের সংসার আশার। তাছাড়া নানারকম সমাজ কল্যাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নিজেকে ব্যস্ত রাখে সে। এত হাসিখুশি আমুদে আর এত পপুলার যে আমি নাকি দেখলে চিনতেই পারব না যে এই আশাই আমাদের সেই আশা।

একটু বাদে ওরা দুজনেই আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে। মনে মনে খুশি হলাম আমার তিলোত্তমা ভাল আছে জেনে। আজ এতদিন বাদে এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পর আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় আশাকে লেখা আমার সেই প্রেমপত্রের কথা। সেই চিরকুটে লেখা খেলার কথা। অনেক ছোট ছোট ঘটনা সিনেমার ফ্ল্যাশ্‌ব্যাকের মত ফিরে এল আমার মনের আয়নায়। একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে ভিড় করে এল। আচ্ছা, ওই খেলাটা কি আমার ছোটবেলার ছেলেমানুষি ছিল? নাকি আমি কি জেনেশুনে আশার সঙ্গে ওই খেলা খেলেছিলাম? আমি কি আশাকে ভালবাসতাম? নাকি আমার আরো গূঢ় কোন উদ্দেশ্য ছিল?

শকুন্তলা খাঁ ভাদুড়ী

লক্ষ্মী পূজা, সঠিক উচ্চারণে “লক্‌ষ্‌মী পূজা”, বা আমাদের বাঙালীদের সাধের “লোক্‌খি পুজো”। করা বেশ সহজ, নিয়মের কড়াকড়ি কম, আর অনুষ্ঠানের দেখভালের জন্য পুরুতের খুব একটা প্রয়োজন নেই। এই বছর তাই লক্ষ্মী পুজোই ঠিক হল। আমার প্রথম “স্বাধীন” পুজো, বাড়ি থেকে দূরে। আর পতিদেব অনেক দিন ধরেই ছোঁকছোঁক করছিলেন লুচি, বেগুনভাজা, পায়েসের জন্যে, তাই নিজেই বেশ উৎসাহভরে “পুজোর বাজার” করে আনলেন মায়ামি-র উত্তর থেকে, পঞ্চাশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে।
ইতস্ততঃ এক পা, দুই পা করে পরিকল্পনা এগিয়ে চলল বাস্তবায়নের দিকে। কিভাবে শুরু করব? কি কি লাগবে? ধর্মেকর্মে আমার খুব একটা মতি কোনদিনই ছিলনা, তাই শশব্যস্তে ফোন করলাম মা আর মামী কে, তাঁরা তো আহ্লাদে আটখানা। কথোপকথন চলল –
“এই তো, কিছু না, খুঊব সোজা। এইটা এইটা লাগবে…” (এক ডজন জিনিসপত্রের ফর্দ, আর তার সঙ্গে না পাওয়া গেলে বিকল্প ব্যবস্থার পরামর্শ)
“পঞ্চশস্য আছে? না না, পাঁচফোড়ন দিয়ে হবে না, শুধু চাল দিয়ে দিস। ডাব না পেলে যে কোন গোটা ফল ঘটে বসিয়ে দিস।”
“লাল গামছা নেই? একটা রুমাল দিয়ে ঘট ঢেকে দিবি… নতুন রুমাল আছে তো? পেপার ন্যাপকিন হলে… নাঃ, পেপার ন্যাপকিন-এ হবে না।”
“বেলপাতা-তুলসীপাতা পাওয়া যাচ্ছে না? মা লক্ষ্মী তো সবই জানেন, বলে দিস এখানে ওসব পাওয়া যায় না… না, রান্নার মশলা শুকনো তুলসীপাতা দেবার দরকার নেই।”
প্রবাসে নিয়মো নাস্তি।
ফর্দ লিখে নিয়ে শুরু হল কাছে দূরে যাবতীয় ইন্ডিয়ান গ্রোসারী স্টোর-এর তত্ত্বতল্লাস। চন্দন – লাল আর সাদা – পাওয়া গেল। ছোট বোতলে গঙ্গাজল – তাও পাওয়া গেল। (“ওটা হরিদ্বার-ব্র্যান্ডের কলের জল” – পতিদেবের ফোড়ন) তামার ঘট, প্রদীপ, সলতে, নতুন কাপড়, নারকোল (“ছোলার ডাল হবে বুঝি?”), পান, সুপুরী, কর্পূর – পাওয়া গেল। পাঁচ রকমের ফল, পাঁচ রকমের তরকারী, ময়দা, সুজি, মিষ্টি – সবই মিলে গেল। জিঙ্ক অক্সাইড পেলাম না। তাহলে আলপনার জন্য পোস্টার কালার-ই সই।
আবার মা-কে ফোন, এবার জিজ্ঞাস্য পুজোর প্রণালী আর ভোগ-নৈবেদ্যর খুঁটিনাটি। কিঞ্চিত অদ্ভুত আলোচনা হল এইরকম –
মা – পঞ্চপ্রদীপ, কর্পূর, ধূপ, জলশঙ্খ, ফুল, পাখা এই সব দিয়ে আরতি করবি।
আমি – জলশঙ্খ নেই। পাখা নেই। এমনি শাঁখে একটু জল দিয়ে আরতি করে দেব, আর কাগজ দিয়ে পাখা বানিয়ে দেব, হ্যাঁ?
মা – ঠিক আছে। পাঁচালী আছে তো?
আমি – চিঙ্কি বলেছে আইপ্যাড-এ ডাউনলোড করে দেবে।
মা – ঠিক আছে, নিবেদন করে নিস।
আমি – আইপ্যাড-টা নিবেদন করে দেব?
মা – না না, ওই ভোগ ফল প্রসাদ এই সবে একটু গঙ্গাজল ছিটিয়ে নিবেদন করে দিস।
আমি – আচ্ছা, ঘটে কি যেন একটা আঁকতে হয়?
মা – হ্যাঁ, কাঠি কাঠি হাত পা-ওলা মানুষ – প্রথমে একটা প্লাস আঁক, তারপর ওপরে একটা গোলমত মুখ, হাত পা গুলো এক্সটেন্ড করে ল্যাটারালি…
আমি – ল্যাটারাল আবার কি? বাইরের দিকে করব তো?
মা – ল্যাটারাল মিডিয়াল বুঝিস না? মিডিয়াল মানে শরীরের মধ্যাংশের দিকে, ল্যাটারাল মানে…
আমি – না ওসব ডাক্তারী ব্যাপার – পুজোর মধ্যে ল্যাটারাল-মিডিয়াল হিজিবিজি… ধুত্তেরি। হাত পা গুলো টেনে টেনে বাইরের দিকে বার করে দেব, এই তো?
মা – হ্যাঁ, আর প্রোপোর্শন-গুলো ঠিক রাখিস, মানে গলা পেট হাত পা…
আমি – ওফফ মা! আচ্ছা আমি রাখছি এখন।
পুজোর দিন সকাল। ঘটের জন্য মালা, যাতে শুকিয়ে না যায় তাই গেঁথে গুছিয়ে ফ্রীজ-এ রাখা। নৈবেদ্যর জন্যে গোবিন্দভোগ চাল ভিজনো। পায়েস তৈরী। ভোগ-এর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা চিঙ্কি রাঁধবে বলে, সে সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছোচ্ছে। মনে মনে একটু গজগজ করলাম নাড়ু, মুড়কি আর দই-এর অভাবের জন্য। এইসব উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ভুলেই গেছিলাম যে আপিস-কাছারী, মিটিং ইত্যাদি জাগতিক ব্যাপারস্যাপারও আছে, নজর দেবার জন্য। কিন্তু কাজ মোটামুটি সাবাড় হয়ে গেল দুপুরের মধ্যে – খুব সম্ভবত দৈবী হস্তক্ষেপে। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে।
দুপুরবেলা। বাড়ির আশেপাশে চক্কর কাটতে গেলাম, যদি একটা সার্বজনীন আমগাছ পাওয়া যায়। এখানে প্রায় প্রত্যেক বাড়ির সামনের জমিতেই বিভিন্ন আমগাছ আছে, কিন্তু আমি খুঁজছি এমন একটা (১) যার কয়েকটা ডালপালা আছে হাতের কাছে (২) যেটা একটু লোকচক্ষুর অন্তরালে। Et voilà! বাড়ি ফিরলাম মহার্ঘ সপ্তপর্ণী আমের ডাল নিয়ে; কিছু কলাপাতা, জুঁই আর জবাও পাওয়া গেল আশপাশের অচেনা প্রতিবেশীর বাগানে। বেশ একটা বারোয়ারি-বারোয়ারি ব্যাপার – আমি প্রসন্নচিত্তে বাড়ি পৌঁছালাম।
সন্ধ্যেবেলা। বসবার ঘরের আসবাব পত্র ঠেলে ঠুলে পুজোর জায়গা হলো। ছোট্ট রুপোর “লক্ষ্মী ঠাকুর”-এর মূর্তি তেপায়া টেবিল-এর ওপরে সাজানো, জবা আর জুই দিয়ে। সামনে প্রদীপ আর ধুপকাঠি জ্বালানোর জন্য তৈরী। ছোট্ট ছোট্ট কলাপাতার টুকরোর ওপরে সমস্ত উপচার – পঞ্চপ্রদীপ, শাঁখ, চন্দন, সিঁদুর, একটা ছোট লালপাথরের বোতলে গঙ্গাজল, কর্পূর, আর ঘট। পোস্টার কালার দিয়ে একটু আলপনা দেবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু খুব একটা দাঁড়াল না দেখে নতুন জোগাড় করা হামানদিস্তায় একটু চাল বাটলাম, অল্প জল দিয়ে লেই বানিয়ে তাই দিয়ে আবার আলপনা আঁকা হল – এবার অনেক সুন্দর হল। নিজেই বাঃ বলে নিলাম একটু।
পতিদেব চিঙ্কি-কে নিয়ে এলেন এয়ারপোর্ট থেকে। বসার ঘরের আমূল পরিবর্তন আর একটা “পুজো পুজো গন্ধ” – তাতে আমি চমৎকৃত, বেশ গদগদ হয়ে পড়লাম। রান্না, কাটাকুটি, ভাজাভুজি শেষে চিঙ্কি আর আমি শাড়ি পড়ে নিলাম, পুজো শুরু হল রাত্রি এগারোটা নাগাদ। বার্মুডার ওপরে একটা পাঞ্জাবী চাপিয়ে আর ভোগের থালায় হাত মেরে পতিদেব আয়োজনে যোগদান করলেন। “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি”র কথা স্বাভাবিক ভাবেই মনে পড়ে যাচ্ছিল।
পূর্ণিমা। আসনে বসে আমাদের বাড়ির আসল পুরুত ঠাকরুণ – মামী – কে অনুকরণ করার চেষ্টা করছি; সমস্ত নৈবেদ্যতে গঙ্গাজল ছিটিয়ে যা যা মন্ত্র মনে ছিল পড়ে গেলাম একধারে, দুর্গা, শিব, নারায়ণ, কালী, চন্ডী, সরস্বতী আর অবশ্যই, লক্ষ্মী – সবাইকেই ডেকে ফেললাম। ভাবলাম সবাই যখন সেই একই সুখী পরিবারের সদস্য, তখন মা লক্ষ্মী নিশ্চয় কিছু মনে করবেন না অন্যান্য দেব-দেবীর সঙ্গে তাঁর পুজো ভাগ করে নিতে। এর পরে তাম্রনির্মিত ঘটের গায়ে সুন্দর কাঠি-চিত্র, ওপরে আমপাতা, নারকোল আর লাল কাপড়, তাতে চাপান প্রায়-জমে বরফ মালা। এবার আইপ্যাড-মারফত পাঁচালী পঠন, আশাতিরিক্ত সুষ্ঠভাবেই হয়ে গেল। সবশেষে বিনা-পাখাতেই আরতি, পুষ্পাঞ্জলি – ব্যাস্‌, পুজো শেষ।
মাথাটা অদ্ভুতরকম হাল্কা লাগছিল, মনে পড়ল সারাদিন দাঁতে কিছু কাটা হয়নি। সেরকমই হওয়া উচিত অবশ্য।
এবার খাওয়ার পালা, তার সঙ্গে প্রসাদ আর ভোগ সেবন। চাঁদ ততক্ষণে আদ্ধেক আকাশ পার করে ফেলেছে। প্রারব্ধ কর্মের সুচারু সমাধানে যুগপৎ উল্লসিত এবং অবসন্ন আমরা এবার শয্যাভিমুখে, যদিও তার আগে চকিতে ফেস্‌বুক-এ ছবি আপলোড হয়ে গেল, আর মা-কে ফোন-এ রিপোর্ট করে দিলাম আমার প্রথম পুজোর সাফল্যের বার্তা।
বহুপরে, এক নিঃশব্দ চিন্তনের মূহুর্তে, একটা চিন্তা – যেটা দানা বাঁধছিল অনেকক্ষণ ধরে – আত্মপ্রকাশ করল স্বমূর্তিতে। বুঝতে পারলাম, আমি এই পুজোটা ধর্মীয় আতিশয্যে করিনি, অথবা মা লক্ষ্মীর কৃপালাভের আর্তচিন্তায়ও নয়। (ঘটনা হল, কোন অনির্দিষ্ট কারণে আমি বরাবরই মা সরস্বতীকে অনেক বেশী কাছের বলে মনে করেছি।)
তো কেন করলাম? এক্কেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ এবং স্বার্থের কারণে – আমার ছোট মায়ামি-র বাড়িকে ওই পি৫৪৪, রাজা বসন্ত রায় রোড-এর একটা অংশে পরিণত করতে। ছোটবেলার স্মৃতিগুলোর সঙ্গে আবার সংযোগস্থাপন করতে, চন্দনকাঠ, ধুপ আর হোম-এর আগুনের চিরপরিচিত রূপকে ফিরে পেতে। মন্ত্রপাঠের অচঞ্চল স্বর, শঙ্খধ্বনির সুরেলা আওয়াজ; তেলের প্রদীপের স্তিমিত আলো; সবুজ পাতার ওপরে রঙীন ফুলের অসাধারণ নকশা; ঘি-কর্পূর-চন্দন-অগুরুর সুবাস। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একাত্মবোধের বাসনাপূরণ। এবং আবার করে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার অবর্ণনীয় অনুভূতি।
এবং আমাদের “তিনতলার ঠাকুরঘর” সাতসমুদ্র পার করে এসে তার আলিঙ্গনে আমাদের ঘিরে ধরল। পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং।
আমরা সেই আশীর্বাদধন্য।

About this blog

hit counter

Sample text

ফেসবুকে আমাকে ফলো করুন

ভিজিটর কাউন্ট

Resources

মোট পোস্ট হল

জনপ্রিয় পোস্ট গুলি

আজকের তারিখ হচ্ছে

Powered by Blogger.

Ads 468x60px

সর্বচ্চ পোস্ট গুলি হল

Social Icons

সমস্ত পোস্ট গুলি এখানে

Featured Posts